নামের মাঝে যে পরিচয়ের দীপ্তি: পারভেজ থেকে ত্বলহার যাত্রা

*** নামের মাঝে যে পরিচয়ের দীপ্তি: পারভেজ থেকে ত্বলহার যাত্রা

নাম—এটি কেবল পরিচয়ের মাধ্যম নয়, বরং আত্মার পরিচয়, আকীদার পরিচয়, এক অন্তর্নিহিত আত্মিক মর্যাদার প্রতিফলন। ইসলামে নামের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি সুন্দর ও অর্থবোধক নাম শুধুমাত্র সামাজিকভাবে শ্রুতিমধুর হওয়ার জন্য নয়, বরং তা যেন হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির উপযোগী ও দীনের পরিচয় বহনকারী।

আমি ছিলাম "পারভেজ" নামে পরিচিত। নামটি পারসিয়ান শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ "বিজয়ী", যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও এটি সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন কিংবা সালাফে সালেহীনের জীবনে পাওয়া যায় না। নামটি ইসলামি রুচির সাথে খাপ খায় না বলে অনেক মুহাক্কিক আলেম এ নাম বর্জন করার পরামর্শ দিয়েছেন।

এমন একটি সময়েই গাজীপুরী হুজুর (দা.বা.) আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন:

"এই নামে দীনের দীপ্তি নেই। সাহাবীদের নামের মাঝে যে ঈমানী তেজ ছিল, তা এই নামে অনুপস্থিত। পারভেজ বাদ দাও, তুমি ত্বলহা হয়ে যাও।"

আল্লাহর কুদরত! আমি তখন থেকেই নিজেকে 'মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা' হিসেবে গঠন করতে শুরু করলাম। এই নামের প্রতি রয়েছে আমার পরিপূর্ণ আত্মিক তৃপ্তি ও এক অপূর্ব মানসিক প্রশান্তি। 'ত্বলহা' নামটি শুধু একটি নাম নয়, বরং এক সাহাবীর স্মৃতি, যিনি উহুদের যুদ্ধে রাসূল (সা.)-এর জন্য নিজের হাত কোরবানি করে দিয়েছিলেন। এমন নাম ধারণ করা শুধু সম্মানের নয়, বরং এটি এক আত্মিক দায়িত্বও বটে।

ইসলামে নাম রাখার আদর্শ কী?

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:

إِنَّ أَحَبَّ الأَسْمَاءِ إِلَى اللَّهِ عَبْدُ اللَّهِ وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ

"আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় নাম হলো 'আব্দুল্লাহ' এবং 'আবদুর রহমান'।"

— সহীহ মুসলিম, হাদীস: 2132

হাদিসে আরও আছে যে, নবীজী (সা.) অনেক সাহাবীর নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন, কারণ সেসব নাম ছিল অশোভন বা জাহিলিয়াতের ছায়া বহনকারী।

তাই প্রিয় পাঠক, আপনার নাম যদি দীনের সৌন্দর্য বহন না করে, তাহলে একবার ভাবুন—এটি পরিবর্তন করার মাঝে কোনো লজ্জা নেই, বরং রয়েছে ঈমানদারিত্বের পরিচয়।

আজ আমি যে নামে লিখছি, যে নামে পরিচিত হচ্ছি, সে নাম "মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা"—এটাই আমার আত্মার পরিচয়। আর এ পরিচয়ই আমি রাখতে চাই আমার জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ইনশাআল্লাহ।

বর্তমানে আমার নাম মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা।

“মুহাম্মদ” নামটি নিয়েছি আমার প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নামে। শুধু ভালোবাসা থেকেই নয়, বরং বরকতের আশায়—যেন তাঁর নামের মতো আমিও তাঁর আদর্শে জীবন গড়তে পারি। আল্লাহ যেন আমাকে নবীজীর চরিত্র ধারণ করার তৌফিক দেন—আমীন।

“মুনীরুজ্জামান” অর্থাৎ “যুগকে আলোকিতকারী”। “মুনীর” মানে আলোকিতকারী, আর “জামান” মানে সময় বা যুগ। আমি চাই—আল্লাহ যেন আমাকে এমন একজন বানান, যে নিজের সময়কে, সমাজকে, মানুষকে আলোর পথে ডেকে নেয়। সত্য, জ্ঞান, ও হেদায়াতের আলোয় আলোকিত করে দেয় চারপাশ।

“ত্বলহা”—এই নামটি নিয়েছি সাহাবী হযরত ত্বলহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রাঃ) এর নাম থেকে। তিনি ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবীর একজন। আমি চাই, আল্লাহ যেন আমাকে তাঁর মতো তাকওয়াবান বানান, দীনের পথে কুরবানি দেওয়ার তাওফিক দেন, এবং ইলম ও আমলের দ্বারায় আমাকে উন্নত করেন।

হযরত ত্বলহার (রাঃ) জীবনে ইলমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে সরাসরি জ্ঞান গ্রহণ করেছেন, তাঁর জীবনেও তা বাস্তবে প্রমাণ করেছেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি নবীজীর প্রাণ রক্ষায় নিজের শরীর ঢাল বানিয়েছেন, আর সেই সাহসিকতা ও ভালোবাসা ইসলামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।

আমি দোয়া করি, আল্লাহ যেন এই নামের অর্থ অনুযায়ী আমাকে গড়ে তোলেন। যেন আমি নবীজীর আদর্শে চলি, যুগকে আলোকিত করি, আর সাহাবীদের মতো তাকওয়া ও ইলমে দৃঢ় থাকি।

আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি