হে তালেবে ইলম তোমাকে
হে তালেবে ইলম তোমাকে ৪র্থ পর্ব
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা
মনে রাখবে,সবার থেকে আগে বাড়তে হলে অতিরিক্ত অনেক মুতালাআ করতে হবে। অনেক পড়তে হবে।তবে উস্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী।নিজ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নয়। আমি এই কথাটা বারবার এজন্য বলি,কারণ আমি জানি যে কোন বইটা পড়লে আমার উপকার হবে,আর কোন বইটা পড়লে আমার ক্ষতি হবে।আমার যোগ্যতা ও মেধা অনুযায়ী আমাকে উস্তাদ কিতাব দিবেন।মুতালাআ করার সময় কাগজ কলম রাখবে,যাতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নোট করতে পার। এবং যা মুতালাআ করবে তা মনে রাখার চেষ্টা করবে।মুতালাআই তোমাকে সবার থেকে এগিয়ে দিবে।যে যত বেশি মুতালাআ করবে,সে তত বেশি ইলমের অধিকারী হবে। তোমাকে কিতাবের পোক বনতে হবে।কিতাব ছাড়া তুমি কিছুই বুঝো না,এমন তালেবে ইলম তোমাকে হতে হবে। আচ্ছা ভাব তো,দরসে বা দরসের বাইরে তুমি যে সমস্ত কিতাব মুতালাআ করো,এই কিতাবগুলো যারা লিখেছেন,তারা কীভাবে লিখলেন এত কিতাব।তারা হাজার হাজার পৃষ্ঠার কিতাব লিখে গিয়েছেন,আর আমরা সেই কিতাবগুলো পড়ব তো দূরের কথা,সেই কিতাবগুলো বুঝারই যোগ্যতা আমার নেই।তাহলে বুঝো,তারা কী পরিমাণ ইলমের অধিকারী ছিলেন একেকজন। তাদের কথা বর্ণণা করে শেষ করা সম্ভব নয়।তারা যে কী পরিমাণ সময়ের হেফাজত করত,তা আমরা কল্পনাও করতে পারব না। সময়ের হেফাজতে তারা ভাত তো দূরের কথা,রুটিই খেতো না।কারণ রুটি খাইলে চাবাতে হবে,এতে সময় নষ্ট হবে।তাই তারা ছাতু খেয়ে থাকত।সময় বাঁচাতে তারা যা করার,তাই করত।আজ তারা এজন্যই এত বড় আলেম হয়েছে। সময়ের প্রতি তারা কী পরিমাণ গুরুত্ব দিত।তা আমাদের কল্পনার বাইরে। আকাবীরদের সময়ের হেফাজত কেমন ছিল, এ ব্যাপারে শায়খ আবুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি একটা চমৎকার কিতাব লিখেছেন। কিতাবের নাম হলো:قيمة الزمان عند العلماء বইটি সংগ্রহ করে নিয়ে ভালোভাবে মনোযোগ দিয়ে পড়বে।তাহলে অবশ্যই তোমার ভিতরে সময়ের গুরুত্ব আসবে।
* আকাবীররা এই ইলম অনেক কষ্ট করে শিখেছে।তারা এত সবর করেছে যে তাদের এই ঘটনাগুলো যদি আমরা পড়ি,তাহলে বিশ্বাসই হবে না।যে ছেলের মৃত্যুতে যদি জানাযায় শরীক হতে হয়,তাহলে তো উস্তাদের দরস ছুটে যাবে।এই ভয়ে শুধু তিনি নিজ ছেলের মৃত্যুতে যান নি।ইলম অর্জনের জন্য কয়েক বেলা না খেয়ে থাকতে হয়েছে।বাতি জ্বালানোর জন্য তেল কিনার টাকা ছিল না,তাই রাস্তার বাতি দিয়ে তারা পড়াশোনা করত। তাদের এধরনের কষ্টের ঘটনা অনেক। এব্যাপারে শায়খ আবুল ফাতাহ আবু গুদ্দাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এক চমৎকার কিতাব লিখেছেন।নাম হলো: صفحات من صبر العلماء.
আমাকে এটা উপলব্দি করতে হবে, আমি এখানে ইলমে ওয়াহি শিক্ষা করছি। এ ইলমে ওয়াহি পৃথিবীর সবকিছু থেকে শ্রেষ্ঠ ও সার্বজনীন। এ কথা সবাই মানে। তবে মানলেই হবে না। এটা অন্তর থেকে মানতে হবে। দিলে এ অনুভূতি জাগ্রত করতে হবে। এ মূল্যবান ইলম অর্জন করতে দিলে তলব তৈরি করতে হবে। তলবের অর্থ হলো একজন মানুষ গরমে প্রচণ্ড পিপাসায় পানি পাচ্ছে না। সে বসে না থেকে পানির সন্ধান করতে ছুটছে। তোমাকেও ছুটতে হবে।
তিনি আরো বলেন, দুনিয়ার ধন-সম্পদ আহরণ করতে যেমন জীবন বাজি রেখে মানুষ কষ্ট করে। তোমাকে দুনিয়া আখেরাতের শ্রেষ্ঠ জিনিস ইলম অর্জন করতেও মেহনত মুজাহাদা করতে হবে। আর সব কিছুর মূল যেহেতু আল্লাহর দরবারে তাই তোমাকে অবশ্যই তার থেকে চেয়ে নিতে হবে।পড়াশোনা করতে আর ইলম অর্জন করতে তোমাকে মুজাহাদ করতে হবে। আর এ মুজাহাদা করতে হবে রুটিন মাফিক। অযথা সময় নষ্ট না করে প্রতিটি সময়কে মহামূল্যবান মনে করা। যে কোনো প্রয়োজন আল্লাহর থেকে চেয়ে নেয়ার অভ্যাস করতে হবে।ইলম অর্জন করতে হলে নিজেকে উস্তাদের কাছে বিলিন করে দিতে হবে। ছাত্রের কাজ হবে সামি’না ওয়া আতা’না। শুনলাম মানলাম। তোমাদের মেহনত অনুযায়ী তোমরা তোমাদের ফল পাবে। তাই সবকিছুর কদর করা।
উপরোক্ত বই দুটি আরবীতে।কমপক্ষে নাহবেমীর শেষ করলে আশা করা যায়,বই দুটো ভালোভাবে পড়তে পারবে।তার আগে বাংলায় এব্যাপারে অনেক কিতাব লেখা হয়েছে। যেমন: আকাবীরের ছাত্রজীবন দুই খন্ড। মাওলানা ইমদাদুল হক রচিচ।এই বইটি সংগ্রহ করে পড়বে। বাজারে খোঁজ করলে এ জাতীয় আরো বই পাবে, সেগুলো পড়ে নিবে। তাহলে এতক্ষণ আলোচনায় কী বুঝলে তুমি,,পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছো।এই লেখাগুলো সময় নিয়ে পড়বে।বারবার পড়বে।তাহলে তোমার ভিতরে তলব পয়দা হবে ইনশাআল্লাহ।আর তলব পয়দা হলেই তো ইলম অর্জনে শত কষ্ট সহ্য করে ইলম শিখতে তুমি প্রস্তুত
হয়ে যাবে। দুনিয়ার সব ঝামেলা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ইলম নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। আল্লাহ তোমাকে কবুল করুন আমীন।
কিতাব সংগ্রহ:
ইলম অর্জনের আরেকটি মাধ্যম হলো কিতাব সংগ্রহ করা। তোমাকে অনেক কিতাব সংগ্রহ করতে হবে। দরসের কিতাব তো আছেই, দরসের কিতাবের সহযোগী আরো কিতাব তোমাকে সংগ্রহ করতে হবে।এই নাহবেমিরের বছরে তোমাকে কয়েকটা অভিধান।ইরাবুল কুরআন,موسوعة النحو الصرف ও المعجم الوسيط في الاعراب ইত্যাদি বহু কিতাব তো নাহবেমিরের বছরই তোমাকে সংগ্রহ করতে হবে।বাকি কখন কোন কিতাব সংগ্রহ করবে,এটা তোমাকে তোমার মুরুব্বি বলে দিবে।তার পরামর্শের বাইরে কোনো বই কিনবে না।আসলে বই সংগ্রহ তো অনেক টাকার প্রয়োজন। তোমার সামর্থ্য অনুযায়ী তুমি বই কিনবে। কখনও বাবা মাকে বা বাসায় কিতাব কিনার জন্য টাকা চেয়ে তাদেরকে চাপ দিবে না। বরং তোমার পরিবার তোমাকে যতটুকু দিতে পারবে, ততটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। নিজের পকেট খরচ জমিয়ে জমিয়ে টাকা বাঁচাতে থাকবে।সেখান থেকে কিছু কিছু করে কিতাব কিনবে।
**মাদ্রাসায় যদি ইসলাহি কোন মজলিস হয় বা সপ্তাহে বা মাসে যদি কোন বয়ান হয়। সেগুলো ভালো করে শোনার চেষ্টা করব। এবং সেগুলোর উপর আমল করব। কাগজ-কলম নিয়ে বসবো এবং গুরুত্বপূর্ণ বয়ান গুলো নোট করব।
**আমি আমার সাধ্যমত উস্তাদদের খেদমত করব। মাদ্রাসা এবং ওস্তাদদের খেদমতের দ্বারা ইলমের মধ্যে বরকত হয়। খালেছ দিলে খেদমত করার চেষ্টা করব। ওস্তাদের কাপড় ধুয়ে দিব, যদি সম্ভব হয় ওস্তাদের বাজার করে দিব, ওস্তাদকে গিয়ে বলবো, হুজুর আপনার কোন খেদমত লাগলে আমাকে অবশ্যই বলবেন। ওস্তাদের খানা উঠানোর চেষ্টা করব। খেদমত করতে করতে এত বেশি করবে না যে পড়ার ক্ষতি হয়ে যায়। বরং উভয়টাকে সমন্বয় করে চলার চেষ্টা করবে। মাদ্রাসার পক্ষ থেকে কোন খেদমতের ডাক আসলে, খেদমত করবে। বসে থাকবে না। এটা ভাববে না যে, আমার পড়ার ক্ষতি হচ্ছে। বরং এতে আল্লাহ আরও বরকত দান করবেন।
** আরবি, উর্দু,বাংলা এই তিন ভাষায় যেমন বলা শিখতে হবে, লেখা ও সুন্দরভাবে শিখতে হবে। তোমার লেখা যেন অনেক সুন্দর হয়। সুন্দর হওয়া এটা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার একটা মাধ্যম। তাই যাদের লেখা সুন্দর ও ভালো, অবশ্যই তাদের থেকে লেখা নিয়ে লেখা শিখবে। আরবি লেখা শিখার ক্ষেত্রে, দুটি ধাপ আছে।১. খত্তে রুকআ২.খত্তে নুসখা। তোমার যেই লেখাটা শিখতে মন চায় সেই লেখাটাই শিখবে। তবে যেটা শিখবে ওইটাই সব সময় লিখবে। একেক সময় একেকটা লিখবে না। তবে আমার মনে হয়, খত্তে রুকআ টা তোমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
উর্দু ভাষায় ও তোমার লেখা অনেক সুন্দর থাকতে হবে। এবং বাংলা লেখাও সুন্দর থাকতে হবে। এইজন্য লেখার পিছনেও মেহনত করতে হবে। ফাকা যে সময়টা পাও, তখন লেখার পিছনে মেহনত করবে। আল্লাহ তোমাকে কাঙ্খিত ফলাফলে পৌঁছার তৌফিক দান করুন।
**মোটামুটি আমি তোমাকে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো জানানোর চেষ্টা করেছি। আরো অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো তুমি নিজেই বুঝতে পারবে। তোমার আকল দাঁড়ায় তুমি ধরতে পারবে যে, আমি কী করব। কোন পরিস্থিতিতে কি করতে হবে, সেটা তোমার মুরুব্বি বলে দিবে। সব সময় মুরুব্বির পরামর্শ অনুযায়ী চলার চেষ্টা করবে।
**এত বেশি মেহনত করতে যাবে না যে তুমি অসুস্থ হয়ে যাও। শরীরের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অনেক ছাত্র এমন আছে যে, তারা এত বেশি পড়াশোনা করে, তারা অনেক রাত জাগে, খাওয়া দাওয়া কম করে, শরীরের প্রতি যত্ন নেয় না, এতে হিতে বিপরীত হয়। তখন সে বাসায় অসুস্থ হয়ে চলে যায়। দীর্ঘদিন সবক মাইর দেয়। ফলশ্রুতিতে তার অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। তাই শরীরের দিকে খেয়াল করে আমাকে মেহনত করতে হবে। বেশি বেশি পানি পান করার চেষ্টা করবে। অতিমাত্রায় খাওয়া করবে না, আবার অতিমাত্রায় ঘুমাবেও না। এটা মনে রাখবে, শরীরের নাম মহাশয়। যাহা শয়, তাই শয়। শরীরকে তুমি যেদিকে নিয়ে যাবে সে ঐদিকেই যাবে।তাই শরীরের যত্ন নিয়েই তোমাকে মেহনত করতে হবে। সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার খেতে হবে। যদি সম্ভব হয় তাহলে, প্রতিদিন দুধ,ডিম,কাজু বাদাম,পেস্তা বাদাম,কাঠ বাদাম, মধু,ঘি,ফল ইত্যাদি যদি ভালোভাবে নিয়মিত খেতে পার তাহলে শরীরের অনেক উপকার হবে। এই পর্যন্ত প্রাথমিক কিছু কথা তোমার সাথে শেয়ার করলাম। আগামী বছর যখন উপরের জামাতে উঠবে, তখন আরো কিছু কথা বলার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
** মুফতি তাকী আল উসমানী সাহেব হুজুর বলেন:
যাহেরি তালিমের সঙ্গে বাতেনি তরবিয়ত জরুরি-
তালিমের সঙ্গে তালিবে ইলমদের দ্বীনি ও আখলাকি তরবিয়তও অত্যন্ত জরুরি। তাই ইলম হাসিলের পাশাপাশি আমল-আখলাকের সংশোধন করাও নিজেদের দায়িত্ব জ্ঞান করুন।
এ ব্যাপারে কোনো রকম অবহেলা করা যাবে না। কোথাও গাফলতি হলে আসাতিযায়ে কেরাম যে তাম্বীহ করবেন তা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।
তাকবিরে উলার সঙ্গে বা-জামাত নামায আদায় করার ইহতিমাম করুন। তালিবে ইলমদের অভ্যস্ত হতে হবে, চলতে-ফিরতে কোনো না কোনো যিকির যেন তাদের মুখে থাকে। বিশেষত-
سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلهِ، وَلَا إِلَهَ إِلّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ.
পাশাপাশি দরূদ শরীফ অধিক পরিমাণে পাঠ করবে।
সোহবতে আহলুল্লাহর ইহতিমাম।।
ইসলামি সমাজের একটি মৌলিক নীতি-
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ.
Comments
Post a Comment