রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বব্যাপী মহত্ত্ব
- Get link
- X
- Other Apps
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বব্যাপী মহত্ত্ব
চরিত্র, ইবাদত, নেতৃত্ব ও বিনয়-নম্রতার এক অভূতপূর্ব সমন্বয়
লিখেছেন:
মুফতি মুহাম্মদ আবু সাঈদ (বরিশালি হুজুর)
সংকলনে:
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান তালহা
ইতিহাসের মহাপুরুষ প্রায়শই মহত্ত্বের ক্ষেত্রগুলোর এক বা দুটি ক্ষেত্রে বিখ্যাত হয়ে থাকে, তবে এক ব্যক্তি মহত্বের সকল ক্ষেত্রগুলোতে স্বাক্ষর রাখবে এবং তাঁর মাঝে মহত্বের সকল উপাদান গুলোর সমন্বয় ঘটবে, ফলে তিনি সন্ধি চুক্তি, শান্তি ও নিরাপত্তা দানে মহান, যুদ্ধক্ষেত্রে মহান, ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় মহান, সততার ক্ষেত্রে মহান, বাহিরে ও অভ্যন্তরে মহান, গোপনে ও প্রকাশ্যে মহান, দুনিয়া বিমূখিতা ও নৈতিক গুণাবলীতে মহান, নেতৃত্ব ও পরিচালনার ক্ষেত্রে মহান, এবং তিনি একজন আদর্শ যুবক, আদর্শ স্বামী, আদর্শ ব্যবসায়ী, আদর্শ বিশ্বস্ত ব্যক্তি, আদর্শ কমান্ডার এবং আদর্শ পিতা। নিঃসন্দেহে সকল মহাপুরুষের মর্যাদার ঊর্ধ্বে এই সর্বব্যাপী মহত্ত্ব অবশ্যই তা মনোনীত ও সর্বশেষ নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্ব।
প্রথম স্তম্ভ
আর মহত্বের প্রথম স্তম্ভ হল আত্মিক গুণাবলী ও ব্যক্তিগত নৈতিকতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সকল আত্মিক ও চারিত্রিক গুণাবলীতে বৈশিষ্ট্য মন্ডিত ছিলেন এ ব্যাপারে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাসে যা বর্ণিত রয়েছে তা এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, এটি মানব ইতিহাসে পরিচিত সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্র।নবুওয়াতের পূর্বে তিনি ছিলেন উত্তম তারুণ্য এবং নিখুঁত, সুস্থ ও পূর্ণাঙ্গ স্বভাবের এক একক দৃষ্টান্ত। এমনকি আপন সম্প্রদায় তাকে বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত করেছেন । তিনি অজ্ঞ পরিবেশে থাকা সত্ত্বে তার তারুণ্যের মাঝে কখনো মদ পান করেছেন বা কোন প্রতিমার পূজা করেছেন অথবা কোন অহেতুক কাজ করেছেন এবং যৌবনের কোন চাহিদার অনুসরণ করেছেন, এরকম কিছুই তার থেকে ঘটেনি। তার সম্প্রদায় যারা ইসলামের দাওয়াতের পরে চরম শত্রুতে পরিণত হয়েছে তাদের কেউ কখনো তাঁকে এ সকল বিষয়ে দায়ী করেনি।তিনি ছিলেন দরিদ্রের প্রেমিক, দুর্বলের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং নির্যাতিতদের সাহায্যকারী। এ কারণে তিনি "হিলফুল ফুজুল" নামক এক চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেছেন, যে চুক্তিতে অজ্ঞতার যুগে কুরাইশ গোত্রের একদল সাহসী ও উদার লোক দুর্বল ও নির্যাতিতদের সাহায্য করার অঙ্গীকার করেছিল। এবং অঙ্গীকার করেছিল নিপীড়িতদের অধিকার মুক্ত করার যে অধিকার লুণ্ঠন করত গোত্রের জালিম শক্তিশালী নেতারা। নবুওয়াত লাভের পরে উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা তার চারিত্রিক গুণাবলীর বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন যে, "আল্লাহর নবীর চারিত্রিক গুণাবলী ছিল স্বয়ং কোরআনে কারীম"অর্থাৎ কোরআনে কারীমের মধ্যে যে আদর্শ ও নীতির কথা এসেছে তা ছিল তার গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা আরও বলেছেন যে, "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ স্বার্থের কারণে কখনো কারো থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি, তবে আল্লাহতালার কোন বিধান লঙ্ঘন হলে তখন তিনি এ কারণে আল্লাহর জন্য শাস্তি প্রদান করতেন।"
এর পূর্বে "হেরা" নামক পর্বতের গুহায় সর্বপ্রথম যখন তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হয়, এবং এরপর তিনি যা দেখেছেন ও শুনেছেন এর থেকে ভীত ও কম্পিত হয়ে বাড়িতে ফিরে তাঁর পত্নী সাইয়েদা খাদিজাকে এই সংবাদ দিলেন, তখন তিনি তাঁকে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিষয়ে বললেন"আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে কখনো অপদস্ত করবেননা, নিঃসন্দেহে আপনি তো আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখেন এবং দুর্বলদের বোঝা বহন করেন, অসহায় ব্যক্তিদের সহায়তা দান করেন এবং মেহমানকে আপ্যায়ন করেন আর দুর্যোগে মানুষকে সাহায্য করেন"
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যক্তিগত গুণাবলীর এই সংক্ষিপ্ত সাধারণ চিত্রের পরে অতি গুরুত্বপূর্ণ সুনির্দিষ্ট চারটি গুণাবলীর বিষয়ে আলোকপাত করবো।
তাঁর মাঝে এই চারটি গুণ পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল, অথচ এর একটি গুণ ও (চারটির সমষ্টি তো বটে) বড় কোন ব্যক্তির মাঝে পূর্ণমাত্রায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, বিশেষ করে যাদের হাতে ক্ষমতা ও নেতৃত্ব রয়েছে।
ক-মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের ক্ষেত্রে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির সর্বোচ্চ স্তরের মাঝে এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা নির্মূলে ও সমাজ গঠনে সর্বোচ্চ স্তরের চেষ্টার মাঝে ইতিহাসে এক অনন্য সমন্বয় সাধন করেছেন।
তিনি নম্রতা, অশ্রু সজলতা, খোদাভীতি ও পরকালের হিসাব ভীতি এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতি চরম একনিষ্ঠতা এবং তার প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের আশা নিয়ে নামাজ, রোজা এবং দুনিয়া বিমূখতা ও সীমাহীন মানুষকে দান করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। ফলে তিনি তাঁর নিকট যতোটুকু সম্পদ আসতো তা মানুষের মাঝে বন্টন করে দিতেন। আর তিনি এবং তার পরিবার দিনের পর দিন ক্ষুধার্ত থাকতেন। এমনকি ক্ষুধায় পেটে পাথর বেঁধে রাখতেন। রাতে নফল এবং তাহাজ্জুদ নামাজে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন। ফলে তাঁর পা ফুলে যেত। তিনি কোন ধরনের পানাহার ছাড়া একসাথে দুই দিন রোজা রাখতেন। তবে তিনি তাঁর সাথী সঙ্গীদেরকে পানাহার ছাড়া লাগাতার রোজা রাখতে নিষেধ করতেন এই আশঙ্কায় যে, তারা কষ্ট বরদাস্ত করতে পারবে না। আর তিনি তাদেরকে বলতেন, "আমি রাত যাপন করি এমন অবস্থায় যে, আমার প্রতিপালক আমাকে পরিতৃপ্ত করেন এবং তৃষ্ণা নিবারণ করান।"
একদা তাঁর পত্নী উম্মুল মুমিনীন আয়েশা এবাদতের মধ্যে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, অথচ আল্লাহ তাআলা কোরআনে কারীমের মধ্যে তাঁকে এ বলে অভয় দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর পূর্বাপর সকল ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন। (অর্থাৎ এমন যেকোনো ত্রুটি যা তাঁর জীবদ্দশায় কখনো ঘটেছে বা ভবিষ্যতে ঘটতে পারে) তখন তিনি তাঁর প্রত্নীকে উত্তরে বললেন,"আমি কি আমার প্রভুর কৃতজ্ঞ দাস হবো না"
এবং তিনি তাঁর পরিবার ও সাথী সঙ্গীদেরকে বলতেন, "আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে তাহলে তোমরা অল্প হাসতে এবং বেশি বেশি কাঁদতে"
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদাত এবংএই ইবাদতের মধ্যে কষ্ট ক্লেশ এবং আত্মত্যাগ তাঁর এতটাই বেশি যে, তিনি ছাড়া যে কারো জন্য তা দুঃসাধ্য ব্যাপার। তাঁর ইবাদত সংক্রান্ত হাদিস ও বর্ণনা তার সুগন্ধি ময় জীবনীর মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ,ব্যাপক ও বিস্তৃত। ইবাদতের মধ্যে তাঁর এই পরিমাণ অক্লান্ত পরিশ্রম তাঁকে কখনো উপযুক্ত বা আবশ্যকীয় মুহূর্তে যে কোনো অফিসিয়াল এবং আইন কানুন ও বিধি-বিধান প্রণয়ন ও অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামরিক কাজকর্মে এগিয়ে আসতে বাধা সৃষ্টি করেনি। তাঁর কখনো কোনো সুযোগ হাতছাড়া হত না। যেকোনো সুযোগ- সময়কে- তিনি উপযুক্ত কাজকর্ম অথবা বক্তব্যের মাধ্যমে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাতেন।
কুরাইশ গোত্রের আবু সুফিয়ান (তৎকালীন সময়ে সে ইসলাম গ্রহণ করেনি) বিশাল বার্ষিক বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে সিরিয়া থেকে ফিরে মদিনার পথ ধরে মক্কার দিকে যাচ্ছিল। তখন নবীজি আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে অতিক্রম করার সুযোগকে ভালোভাবে কাজে লাগালেন। অথচ মদিনায় নবীজি হিজরত করেছেন বছর খানিক আগে। এখনো তিনি অসংখ্য এবং শক্তিশালী শত্রুদের মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি গড়ে তুলতে পারেননি। এবং বাধ্য হয়ে এই মাতৃভূমি ত্যাগের কারণে যে সমস্যা, পেরেশানি এবং জীবন জীবিকা নির্বাহে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল তা থেকে তিনি এখনো সেরে ওঠেননি।
আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে অতিক্রম করার এই সুযোগকে ব্যবহার করার এবং এ ব্যাপারে উদাসীন না থেকে সতর্ক থাকার চিরন্তন ফলাফল হলো বদরের মহান যুদ্ধ, যা কুরাইশ কাফেরদের শক্তিকে শেষ করে দেয় এবং তাদের মূল উৎপাটন করে দেয়। এবং কুরাইশের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদেরকে নিঃশেষ করে দেয় আর মুসলমানদের প্রতি ভীতি বাড়িয়ে দেয়।
তারপর প্রতিশোধ মূলক অহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের পর তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্বীয় অবস্থানে অবিচল থাকার ব্যাপারে রাসূলের নির্দেশ অমান্য করার কারণে আবার পরাজিত হলো, এবং তারা দুর্বল হয়ে মদিনায় ফিরে আসলো, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশঙ্কা করলেন যে, শত্রুরা মুসলমানদেরকে দুর্বল ভেবে পুনরায় তাদের উপর হামলা করবে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে (অথচ তারা মদিনায় ফিরে এসে এখন পর্যন্ত অস্ত্র রাখতে পারেনি) নিয়ে দ্রুত কাফেরদের সেনানিবাসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলেন পুনরায় তাদের সাথে যুদ্ধ করার লক্ষ্যে।
পরবর্তীতে শত্রুরা যখন এই সংবাদ জানতে পারলো, তখন তারা ভীত হয়ে যতোটুকু অর্জন করেছে তার উপর সন্তুষ্ট থেকে দ্রুত মক্কার দিকে পথ ধরল। এবং মুসলমানরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে মদিনায় ফিরে আসলো। এবং তাদের নিজেদের ভুলের কারণে পরাজয় বরণ তাদের মনোবল ও আত্মিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়ার পর পুনরায় তারা তাদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মিক শক্তি ফিরে পেয়েছে। আর এটা ছিল তাদের জন্য একটি উপদেশ মূলক অধ্যায় যার উপকারিতা ভবিষ্যতে তাঁদের সমগ্র সামরিক জীবনের ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে।
খ-তাঁর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল , অত্যন্ত নম্রতা, বিনয় এবং পরার্থপরতা, যা কর্তৃত্ব সম্পন্ন মহান ব্যক্তিদের মধ্যে খুবই বিরল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যক্তিত্বের ভাব গাম্ভীর্য এবং তার সঙ্গীদের তাঁর প্রতি অগাধ ভক্তি সম্মান ও শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তাঁর বিনয় ও নম্রতার মধ্যে ছিল সমস্ত ধরণের আড়ম্বর এবং অহংকার থেকে দূরে থাকা, যা শাসক এবং নেতৃস্থানীয়দের সাধারণত বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকে এবং এর জন্য তারা অত্যন্ত লোভী হয়ে থাকে।
তাই তিনি বাহ্যিক বেশভূষা, পোশাক ও সভা, সেমিনারে এবং দৈহিক কাজকর্মে তাঁর সাথী সঙ্গীদের সাথে সমানভাবে অংশীদার হতেন। এবং তিনি সাথী সঙ্গীদের থেকে কোন কিছুতে ভিন্নতা গ্রহণ করতে অপছন্দ করতেন। তিনি খন্দক যুদ্ধে সাথী সঙ্গীদের সাথে লম্বা পরিখা খনন করেছেন এবং মাটি অন্যত্র সরিয়েছেন। আর সফরের মধ্যে সাথী সঙ্গীদের খাবার রান্না করার সময় হলে তিনি তাদের জন্য লাকড়ি সংগ্রহ করতেন। তাঁর বাহ্যিক বেশভূষা এতটাই সাধারণ ছিল যে, তিনি মসজিদে তাঁর সাথী সঙ্গীদের মাঝে থাকা অবস্থায় তাঁর নিকট কোন আগন্তুক আসলে এভাবে সে তাঁর কথা জিজ্ঞাসা করতো: তোমাদের মধ্যে মোহাম্মদ কে? তখন সাথী সঙ্গীরা তাঁর দিকে ইশারা করে দেখিয়ে দিতেন। কারণ তিনি তাদের মাঝে সাধারন বেশভূষায় থাকতেন।
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লজ্জার বর্ণনা তাঁর প্রিয় সাহাবী আবু সাঈদ খূদরি এভাবে দিয়েছেন যে, তিনি কুমারী নারী (যখন সে সদ্য স্বামীর সঙ্গে একান্তে মিলিত হয়) থেকে অধিক লজ্জাশীল ছিলেন।
আর তাঁর পরার্থপরতা ও দুনিয়া বিমুখীতার মধ্যে ছিল, তাঁর নিকট অঢেল উপহার -উপঢৌকন -ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আসতো, তখন তিনি সাথে সাথে এই সম্পদ উপযুক্ত ব্যক্তিদের মাঝে বন্টন করে দিতেন। আর তিনি জীবন কাটাতেন এভাবে যে, তাঁর কাছে এই সম্পদের কিছুই বাকি নেই। সাহাবীদের মধ্যে কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষুধা অনুভব করে তাঁর নিকট বড় পেয়ালায় দুধ হাদিয়া নিয়ে আসতেন, তখন তিনি সুফ্ফাবাসীদের (তারা ছিল মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে অসচ্ছল) ডেকে তাদের সকলের সামনে এই পাত্রটি রাখতেন, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারা সকলে পান করার পর অবশিষ্টাংশ পান করতেন।
হযরত সাইয়েদা আয়েশা থেকে বর্ণিত রয়েছে যে তিনি বলেছেন, মুহাম্মাদের পরিবার মদিনায় আগমনের পর গমের রুটি দিয়ে লাগাতার তিন দিন তৃপ্তি সহকারে ভক্ষণ করেনি।
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মৃত্যুবরণ করেছেন তখন ঋণের পরিবর্তে তাঁর বর্মটি এক ইয়াহুদী ব্যক্তির নিকট বন্ধক ছিল। এ বিষয়ে বুখারী এবং মুসলিম শরীফের মধ্যে বর্ণনা রয়েছে।
অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এবং দুনিয়া বিমুখীতার এই স্বভাব খুবই দুষ্কর বরং শাসক ও নেতৃস্থানীয়দের মাঝে নাই বললেই চলে! কারণ তারা ক্ষমতা ও প্রভাবের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ আহরণের পাশাপাশি সেরা সেরা বাড়ি, যানবাহন এবং অন্যান্য বিলাসবহুল জিনিসের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের উপর নিজেদেরকে প্রাধান্য দিতে অভ্যস্ত।(এমনকি গণতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার দেশগুলোতেও অবস্থা এর থেকে ভিন্ন না)
গ-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নৈতিক গুণাবলীসমূহের আরেকটি (যা শাসক ও নেতাদের মাঝে পাওয়া খুবই দুষ্কর) হলো, নিজের স্বার্থবিরুদ্ধ হলেও সত্যের অনুগত থাকা:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ইহুদি থেকে ঋণ নিয়েছেন, তারপর ইহুদী লোকটি তার ঋণ তলব করতে আসলো। কিন্তু রাসূলের নিকট ঋণ পরিশোধের মত কিছুই ছিল না। তখন ইহুদি লোকটি খুব শক্ত ভাষায় কথা বললো, ফলে হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব উত্তেজিত হলেন। তখন আল্লাহর নবী ওমরকে বারণ করে বললেন, ওমর! তুমি শান্ত হও। কারণ হক ওয়ালার কিছু বলার অধিকার আছে।
এই মহৎ বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পৃক্ত আরেকটি গুণ (যা শাসক শ্রেণিদের মধ্যে পাওয়া খুব দুর্লব ব্যাপার) হলো, অজ্ঞ ও নিষ্ঠুর লোকের নিষ্ঠুরতা ও কষ্টদায়ক আচরণের উপর ধৈর্য ধারণ করা।
রাসুলের প্রিয় সাহাবী হযরত আনাস রাসুলের সাথে এক গ্রাম্য ব্যক্তির আচরণের বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূলের সাথে হাঁটছিলাম, আর তাঁর গায়ে ছিল মোটা কিনারা বিশিষ্ট একটি নাজরানি চাদর, তখন এক গ্রাম্য ব্যক্তি এসে রাসুলের চাদর ধরে শক্তভাবে টান দিলো। তারপর আমি রাসুলের কাঁধের দিকে তাকিয়ে দেখলাম যে, শক্তভাবে টান দেয়ার কারণে চাদরের কিনারা রাসুলের কাঁধে দাগ কেটেছে। তারপর সে বলল, মোহাম্মদ! তোমার কাছে আল্লাহর দেয়া যে সম্পদ আছে সেখান থেকে আমাকে দিতে বল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলেন। তারপর তাকে দান করার নির্দেশ দিলেন।
এজাতীয় আরো বহু ঘটনা রাসুলের জীবনীতে প্রসিদ্ধ আছে।
- Get link
- X
- Other Apps
Comments
Post a Comment