কুরবানী ঈদ: ঈমানের শক্তি ও সহানুভূতির প্রকাশ
জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম রূপগঞ্জ এ কুরবানী সম্পর্কে দেয়ালিকা প্রকাশের অনুমতিতে আমি এই লেখাটি পেশ করলাম।।
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা
কুরবানী ঈদ: ঈমানের শক্তি ও সহানুভূতির প্রকাশ
কুরবানী ঈদ, যা মুসলিম জীবনের এক অদ্বিতীয় মহাসম্মানিত মুহূর্ত, কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি অমৃতস্বরূপ ত্যাগের মহাকাব্য, যা আমাদের অন্তরের অন্ধকারে আলোর প্রক্ষেপণ করে। এটি এক অজেয় শক্তির প্রদর্শনী, এক নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের প্রতীক, যা মানবজীবনের গভীরতম স্তরে স্পন্দিত হয়ে ওঠে। ঈমানের দৃঢ়তা, একনিষ্ঠ আনুগত্য এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের এক মহামানবিক চিত্রকল্প; যেখানে প্রতিটি স্নেহময় অক্ষর একটি আত্মিক সুরের মতো কল্পনা ও বাস্তবতার মাঝে এক মেলবন্ধন তৈরি করে।
এই ঈদ, যাহা আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত প্রেমের এক মহান পরীক্ষণ, তার ইতিহাসে নিহিত রয়েছে এক অমোঘ দৃষ্টি, যে দৃষ্টিতে আমরা দেখি হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহৎ আত্মত্যাগ। তাঁর ত্যাগের মধ্যে যেন এক অনন্ত শক্তির ভাঁজ ছিল, যেখানে মানবজাতির জন্য ছিল অগণিত শিক্ষা। যখন তিনি আল্লাহর আদেশে তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানী করতে প্রস্তুত হলেন, তখন এই একটি পদক্ষেপ ছিল একমাত্র তাঁর ঈমানের সংকল্প এবং আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ আনুগত্যের অমোঘ নিদর্শন। এটি কেবল একটি পিতার ত্যাগ নয়, বরং মানবজাতির জন্য এক অমর মন্ত্র—একটি ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক প্রতিবাদ, যেখানে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কিছুকে সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য উপস্থাপন করা হয়।
কুরবানী ঈদ আমাদের দেখায়, যে ত্যাগ কখনোই আত্মাহীনতা তৈরি করে না, বরং তা আমাদের অন্তরকে শুদ্ধ করে, আমাদের আত্মাকে এক চিরন্তন আলোয় পরিপূর্ণ করে তোলে। প্রতিটি পশু, যে বিসমিল্লাহ বলে আল্লাহর নাম স্মরণ করে পৃথিবীতে আসে, তা যেন আমাদের এক গভীর অনুধাবন করিয়ে দেয়—এটি শুধুমাত্র একটি রূপক নয়, বরং এটি আমাদের নিজস্ব আত্মত্যাগের এক মহৎ ধারাবাহিকতা। পশু জবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি নিবেদিত সেই যে উপহার, তা মানবিকতা ও সৌহার্দ্যের এক অভূতপূর্ব অমৃত ধারা হয়ে পৃথিবীর দরিদ্রতম কোণে কোণে পৌঁছে যায়।
এটি শুধু মাংস বিতরণ নয়, বরং এটি সমাজের প্রতি এক অগণিত দায়বদ্ধতার প্রকাশ—এক ধরনের আশীর্বাদ, যা এক কণার মতো ক্ষুদ্র হয়ে মানবতার মধ্যে বিস্তার লাভ করে। এর মাধ্যমে আমরা সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে নিজেদের অন্তরের স্নেহময়ী শাখায় আশ্রয় দিই। এটি দুঃখী, অভাবী এবং অসহায় মানুষের মুখে হাসির জোয়ার নিয়ে আসে, যেখানে ক্ষুধার্ত হৃদয় আল্লাহর রহমত দ্বারা পরিপূর্ণ হয়। এভাবে কুরবানী ঈদ আমাদের শেখায়, ত্যাগ কখনোই হীন হয়ে ওঠে না, বরং এটি বৃহত্তর শান্তি, সুখ এবং সমৃদ্ধির বীজ বপন করে।
কুরবানী ঈদে নিহিত রয়েছে এক গভীর মানবিক শিক্ষার সংজ্ঞা, যেখানে সকলের জন্য সুখের এবং শান্তির এক উপহার উপলব্ধি হয়। এটি শিখায়, যে নিজস্ব সুখের জন্য যদি আমরা কিছু ত্যাগ করতে পারি, তবে আমাদের সমাজে এক অপরিসীম শৃঙ্খলা এবং আনন্দের জন্ম হয়। প্রতিটি পশু জবাই, প্রতিটি দান, প্রতিটি সহানুভূতির মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের জীবনে মহান এক শিক্ষা লাভ করি—যা আমাদের চিরকালীন পথপ্রদর্শক হয়।
এই ঈদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে সত্যিকার ত্যাগ কোনো ক্ষতি নয়, বরং এটি আমাদের হৃদয়ে অমূল্য শক্তির এক উৎসার। এটি আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে, আমাদের সম্পর্কগুলিকে গাঢ় করে, এবং আমাদের সমাজকে সুসংহত করে। তাই কুরবানী ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি এক মহৎ সংস্কৃতির প্রতীক, যা আমাদের অন্তরে মানবতার শিখা জ্বালিয়ে দেয়, আমাদের অস্তিত্বের প্রগতি এবং আল্লাহর প্রতি গভীর অনুগতির একটি সশক্ত শপথ হয়ে ওঠে।
Comments
Post a Comment