সাহাবায়ে কেরাম: ঈমান, ত্যাগ ও তাওয়াক্কুলের দুর্লভ প্রদীপ
সাহাবায়ে কেরাম: ঈমান, ত্যাগ ও তাওয়াক্কুলের দুর্লভ প্রদীপ
(বাতিলের মুখোশ উন্মোচনে এক দীপ্ত জবাব)
লিখেছেন:
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা, দ্বীনের দীপ্তি
ভূমিকা
আলোকচ্ছটার শেষ বিন্দুটি যখন দিগন্তের নিচে হারিয়ে যায়, তখন সত্যের প্রদীপ হয়ে ওঠেন সেইসব মানুষ, যাঁরা অন্ধকারে আলোর পথ দেখান। এমনই এক যুগ অতিক্রম করেছিল মানবসভ্যতা, যখন আরবের বুকজুড়ে অজ্ঞতার আঁধার চেপে বসেছিল, আর মক্কার আকাশে গর্জে উঠেছিল এক আলোকিত আহ্বান—
“قولوا لا إله إلا الله تفلحوا”
“তোমরা বলো, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই’, তাহলেই সফল হবে।”
এই আহ্বানের উত্তর দিল একদল সাহসী, বিশুদ্ধ হৃদয়ের মানুষ—যাঁদেরকে আমরা চিনি সাহাবায়ে কেরাম নামে। তারা হলেন সেই মহামানবদের দল, যারা ছিলেন কুরআনের প্রথম শ্রোতা, নবীর প্রথম সাথী, দ্বীনের প্রথম বাহক, এবং উম্মাহর শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ঈমান, ভালোবাসা ও সম্মান—একটি মৌলিক ঈমানি দাবি। আর যারা এই মহান জামাআতের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে, ইতিহাস তাদের স্থান করেছে জাহান্নামের আগুনে।
এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করবো—
সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ঈমান: কুরআন-হাদীসের আলোকে
তাদের আত্মত্যাগ, যাহাদ ও ইখলাস
সাহাবীদের প্রতি ভালোবাসা: আকীদার স্তম্ভ
যেসব বাতিল দল সাহাবাদের গালি দেয়: তাদের পরিচয় ও জবাব
আমাদের করণীয় ও দ্বীনি দায়িত্ব
সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ঈমান: কুরআন ও হাদীসের আলোকে
সাহাবীদের প্রতি ঈমান রাখা নিছক ঐতিহাসিক শ্রদ্ধাবোধ নয়, বরং তা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন—
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
“আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে উত্তমভাবে—আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।”
(সূরা তাওবা: ১০০)
এই আয়াতে সাহাবাদের মর্যাদা এতটাই স্পষ্ট যে, যারা তাদের অনুসরণ করবে, তারাও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
لا تسبوا أصحابي، فوالذي نفسي بيده، لو أن أحدكم أنفق مثل أُحدٍ ذهبًا ما بلغ مُدَّ أحدهم ولا نصيفه
“আমার সাহাবাদের গালি দিও না। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, যদি তোমাদের কেউ উহুদের সমান সোনা সদকা করে, তবুও সে তাদের একজনের এক মুদ বা অর্ধেক মুদ সদকার সমান হতে পারবে না।”
(সহীহ বুখারি: হাদীস ৩৬৭৩; সহীহ মুসলিম: হাদীস ২৫৪০)
এই হাদীসটি পাওয়া যায়:
কিতাব: الجامع الصحيح للبخاري
মুসান্নিফ: ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল-বুখারি (রহ.)
ওফাত: ২৫৬ হিজরী
প্রকাশক: مكتبة الرشد، الرياض، السعودية
এবং
كِتَاب: الجامع الصحيح لمسلم
মুসান্নিফ: ইমাম মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ আন-নিশাপুরী (রহ.)
ওফাত: ২৬১ হিজরী
প্রকাশক: دار إحياء التراث العربي، بيروت
এখানে নবীজির শপথ করে বলার ধরন থেকেই বোঝা যায়, সাহাবীদের তুলনা কোনো কালে, কোনো উম্মতের জন্য সম্ভব নয়। তাদের প্রতি ঈমান রাখা মানে ঈমানকে রক্ষা করা, আর তাদের অবমাননা মানে ঈমানের গৌরবকে পদদলিত করা।
* ঈমানের দীপ্ত আলো: সাহাবায়ে কেরামের ত্যাগ, কষ্ট ও ইখলাসের অনুপম দৃষ্টান্ত :
যখন সত্যের আহ্বানে প্রথম সাড়া দিয়েছিল মক্কার সেই একদল গরীব, নিঃস্ব, অথচ হৃদয়ে ঈমান জ্বলজ্বল করত, তখনই ইসলাম তার প্রথম রক্তিম ইতিহাস রচনা করে। সাহাবায়ে কেরামের জীবন হলো এমন এক সমুদ্র, যার প্রতিটি তরঙ্গে রয়েছে আত্মত্যাগ, কোরবানির সৌরভ ও ঈমানের সুগন্ধ।
আল্লাহ বলেন—
لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা গাছতলায় তোমার (রাসূলের) হাতে বায়আত করেছিল।”
(সূরা ফাতহ: ১৮)
এই বায়আতের নাম বাই‘আতুর রিদওয়ান। সেখানে সাহাবিরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। যারা পেছনে ফিরতে জানতেন না, জানতেন শুধু আল্লাহর জন্য জীবন উৎসর্গ করতে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহচর্যে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে হযরত খব্বাব ইবনে আরাত (রাঃ) এর পিঠ আগুনে দগ্ধ করা হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরামের আত্মত্যাগের প্রতিটি দৃষ্টান্ত যেন মুছরাফ কিতাবের পাতার সোনালি অক্ষর।
হাদীস:
عن خباب بن الأرت قال شكونا إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم وهو متوسد بردة له في ظل الكعبة، فقلنا ألا تستنصر لنا ألا تدعو لنا...
“আমরা খব্বাব ইবনে আরাত বললেন, আমরা নবীজির কাছে অভিযোগ করলাম, তখন তিনি কাবার ছায়ায় চাদর মাথায় দিয়ে শুয়েছিলেন। আমরা বললাম, আপনি কি আমাদের জন্য দোয়া করবেন না? সাহায্য চাইবেন না?”
(সহীহ বুখারি: হাদীস ৩৬১২)
কিতাব: الجامع الصحيح للبخاري
মুসান্নিফ: ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল-বুখারি (রহ.)
ওফাত: ২৫৬ হিজরী
প্রকাশক: مكتبة الرشد، الرياض
হযরত সুমাইয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা ইসলামের প্রথম নারী শহীদা—যার বুক চিরে বর্শা বিদ্ধ করা হয়েছিল শুধু “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার অপরাধে। তার পাশে দাঁড়িয়ে তার স্বামী ইয়াসির (রাঃ) ও ছেলে আম্মার (রাঃ)-এর ওপর চলছিল পাষাণ অত্যাচার। তখন নবীজি বললেন
صبرا آل ياسر فإن موعدكم الجنة
“হে ইয়াসির পরিবার! ধৈর্য ধরো, তোমাদের ঠিকানা তো জান্নাত।”
(মুসনাদ আহমাদ: হাদীস ৩৭৭৭)
কিতাব: مسند الإمام أحمد بن حنبل
মুসান্নিফ: ইমাম আহমাদ ইবনে হানবাল (রহ.)
ওফাত: ২৪১ হিজরী
প্রকাশক: مؤسسة الرسالة، بيروت
উহুদ যুদ্ধে হযরত আনাস ইবনে নাযর (রাঃ) বললেন—
“وَاهاً لِرِيحِ الْجَنَّةِ، أَجِدُهَا دُونَ أُحُدٍ!”
“আহ! জান্নাতের ঘ্রাণ তো আমি উহুদের ঠিক পেছনেই পাচ্ছি!”
(সহীহ বুখারি: ২৮০৫)
এ কথার পর তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং ৮০টিরও বেশি আঘাতে শহীদ হন—তার শরীরে কোনো দিক এমন ছিল না যেখানে অস্ত্রের আঘাত ছিল না।
এই সাহাবিদের জীবনে ছিল না কোনো মিথ্যা স্বপ্ন, ছিল শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পবিত্র তৃষ্ণা। তাঁদের কষ্টই ছিল দ্বীনের প্রসার, আর তাদের রক্তেই লিখিত হয়েছে ইতিহাসের অমর কাব্য।
**
ভালোবাসার মানদণ্ড: সাহাবায়ে কেরামের প্রতি মহব্বত ঈমানের চাবিকাঠি
সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের প্রতি ভালোবাসা কেবল ইতিহাস বা সংস্কৃতির দাবী নয়—এটি ঈমানের মৌলিক শর্ত। আল্লাহ এবং রাসূলের প্রতি যারা ঈমান এনেছে, তাদের হৃদয় কখনো সাহাবীদের প্রতি বিদ্বেষ ধারণ করতে পারে না। কারণ সাহাবীদের ভালোবাসা—এটা নবীজির ভালোবাসা, আর নবীজির ভালোবাসা মানে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের সোপান।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
"آية الإيمان حب الأنصار، وآية النفاق بغض الأنصار"
“আনসারদের ভালোবাসা হলো ঈমানের নিদর্শন; আর আনসারদের প্রতি বিদ্বেষ হলো নিফাকের আলামত।”
(সহীহ বুখারী: ১৭, সহীহ মুসলিম: ৭৫)
কিতাব: الجامع الصحيح للبخاري
মুসান্নিফ: ইমাম আল-বুখারী (রহ.)
ওফাত: ২৫৬ হিজরী
প্রকাশক: مكتبة الرشد، الرياض
কিতাব: الجامع الصحيح لمسلم
মুসান্নিফ: ইমাম মুসলিম (রহ.)
ওফাত: ২৬১ হিজরী
প্রকাশক: دار إحياء التراث العربي، بيروت
এই হাদীসে "আনসার" বলতে সাহাবীদেরই এক মহান দলকে বুঝানো হয়েছে—যারা মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আশ্রয় ও সাহায্য দিয়েছেন। এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়, সাহাবীদের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে ঈমান পরিপূর্ণ হয় না।
আরেক হাদীস:
"من أحبهم فبحبي أحبهم، ومن أبغضهم فببغضي أبغضهم"
“যে তাদের ভালোবাসে, সে আমার ভালোবাসার কারণে তাদের ভালোবাসে। আর যে তাদের ঘৃণা করে, সে আমার প্রতি ঘৃণার কারণে তাদের ঘৃণা করে।”
(মুসলিম: ২৫৪১)
এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহ.) বলেন:
"حب الصحابة من أصول الإيمان وأركان الدين، وبغضهم من علامات أهل الضلال والبدع"
“সাহাবীদের প্রতি মহব্বত ঈমানের মূল ও দ্বীনের স্তম্ভ। আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ হলো গোমরাহ ও বিদআতিদের আলামত।”
(শরহ মুসলিম, ইমাম নববী; প্রকাশক: دار الفكر، بيروت)
এভাবেই সাহাবাদের ভালোবাসা ঈমানের মানদণ্ড, আর তাদের বিরুদ্ধাচরণ নিফাকের পরিচয়।
আসলে সাহাবীদের প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়—এটি আকীদা। যাদের হৃদয়ে তাদের জন্য সম্মান নেই, তারা দ্বীনের শত্রু, যদিও তারা মুখে মুসলমান বলে পরিচয় দেয়।
ঈমানের অটুট বন্ধন: সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অবিচল প্রেম ও শ্রদ্ধার স্বরূপ
সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ভালোবাসা কেবলমাত্র অতীতের ইতিহাস বা ভাস্বর স্মৃতি নয়; এটি মুসলমানের অন্তর থেকে আবেগ, শ্রদ্ধা ও ঈমানের অঙ্গ। তারা ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে বিশ্বস্ত, সাহসী ও পবিত্র সঙ্গী, যাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা ও নবীজির বিশেষ সন্তুষ্টি ও মেহেরবানী ছিল।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ফেরেশতাদের বক্তব্যের মাধ্যমে ইরশাদ করেন:
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
"অগ্রণী ছিলেন প্রথম যারা হিজরাত করেছিল মেহমানবশী ও আনসারদের মধ্যে, এবং যারা তাদের ভালো কাজের মাধ্যমে অনুসরণ করেছিল। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তাদের জন্য রয়েছে এমন বাগান যেখানে নদীগুলো প্রবাহিত হয়, তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এটাই মহাপ্রাপ্তি।"
(সূরা তাওবা: ১০০)
এই আয়াত সাহাবায়ে কেরামের শ্রেষ্ঠত্ব ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ঘোষণা। তারা শুধু রাসূলের সঙ্গী ছিলেন না, বরং দ্বীনের শাখা-প্রশাখার মূল স্তম্ভ। তাই তাদের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সাহাবাদের জীবনের উদাহরণ:
তারা বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ, ইহকাল ও আখেরাতের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। হাদিসে বর্ণিত:
عن عبد الله بن عباس رضي الله عنهما قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: "الصحابة كالجمال لا تعرف قيمتهم إلا إذا فقدتهم"
“আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবীজী (সা.) বলেছেন: সাহাবারা উটের মতো, তোমরা তাদের মূল্য জানবে না যতক্ষণ না তাদের হারাও।”
(আল-মুসন্নাফ, আবু শামা: ১/৮৫)
এখানে সাহাবাদের মূল্যায়ন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর, যা তাদের সজীব ইতিহাসকে তুলে ধরে।
আলেমদের বক্তব্য:
ইমাম আল-বাইহাকি (রহ.) তাঁর গ্রন্থ ‘সুন্নতু আল-কুবরা’তে বলেন,
"محبة الصحابة من الإيمان بالله ورسوله"
“সাহাবাদের প্রতি ভালোবাসা হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমানের অন্তর্গত।"
(সুন্নতু আল-কুবরা, ৩/৩২৭)
এমনকি যারা সাহাবাদের কিছু ভুল ব্যাখ্যা করেন, তাদের প্রতি সতর্কতা জানানো হয়েছে।
অবিশ্বাসীদের ভ্রান্ত অভিযোগ:
কিছু বিদ্বেষী দল সাহাবাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে, যেগুলো কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা কঠোরভাবে নাকচ। যেমন, তারা সাহাবাদের ভুল বোঝানো ও অপবাদ দিয়ে দ্বীনের ভিত্তি নাড়া দিতে চায়।
ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহ.) বলেছেন:
"من سب الصحابة فقد سبني، ومن سبني فقد سب الله."
"যে সাহাবাদের অপবাদ দেয়, সে আমাকে অপবাদ দেয়, আর যে আমাকে অপবাদ দেয় সে আল্লাহকে অপবাদ দেয়।"
(মাজমা’ আল-ফাতাওয়া, ১/৭৮)
সুতরাং, সাহাবাদের প্রতি অবিচল ভালোবাসা ঈমানের মূল স্তম্ভ।
***
অন্ধ বিদ্বেষের আগুন: বাতিল দল ও সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র
ইসলামের ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে যেসব বিদ্বেষ ও অপপ্রচার হয়েছে, সেগুলো কেবল সাময়িক ঘটনা নয়, বরং একটি দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। অনেক সময়ের একদল বাতিল গোষ্ঠী সাহাবাদের সম্মান হরণ করার মাধ্যমে দ্বীনকে দুর্বল করার চক্রান্ত করেছে। এ ধরনের দলগুলি কখনও কখনও ‘মুরজিয়াহ’, ‘খাওয়ারিজম’, ‘মুআতজিলাহ’ এবং ‘রাওফিজি’ প্রভৃতি বিদ্বেষমূলক মতাদর্শের আওতায় পড়েছে।
প্রাচীন কিতাব থেকে বর্ণনা:
ইমাম আল-বাইহাকি (রহ.) তাঁর গ্রন্থ ‘আল-সুন্নাতু আল-কুবরা’ (মাকতবা আল-রাশিদ, বেইরুত, ১৩৪৫ হিজরী) এর প্রথম খণ্ডে উল্লেখ করেন:
"إن أعداء الصحابة أرادوا بهم السوء، وأخذوا يبدعون في ذلك ألوانا من الأكاذيب والافتراءات"
“সাহাবাদের শত্রুরা তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যার অসংখ্য রূপ আবিষ্কার করে, তাদের খ্যাতি কলুষিত করতে।”
ইবনে কাসীর (রহ.) তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া’-তে (মাকতবা কুতুবিয়া, কায়রো, ১৩৭২ হিজরী) লেখেন:
"وكان فيهم من يزعم أن الصحابة قد أخطأوا في الدين، وأن النبي صلى الله عليه وسلم قد ظلمهم، وهو قول لا يقره إلا جاحد أو جاهل."
“কিছু মানুষ দাবি করে যে সাহাবারা দ্বীনে ভুল করেছে এবং নবীজিকে তাদের ওপর অন্যায় হয়েছে, যা শুধু অজ্ঞান বা দুর্বৃত্তই স্বীকার করতে পারে।”
বিদ্বেষের কারণ ও প্রভাব:
১। ঈমানের দুর্বলতা: সাহাবাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই তাদের ঈমানের স্তর প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা ভুল ধারণা ছড়ায় যে সাহাবারা “অপরিপূর্ণ” বা “ত্রুটিপূর্ণ” ছিলেন। এই অভিযোগ ইসলামের মূল ভিত্তিকে বিপদে ফেলে।
২। সামাজিক বিভাজন: এই বিদ্বেষের ফলে মুসলিম সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি হয়। একটি অংশ সাহাবাদের পক্ষ নেয়, আর অন্য অংশ অবজ্ঞা প্রদর্শন করে, যা ঐক্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
৩। আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস: আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন, যারা নবী ও সাহাবাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ করে তারা মূলত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ করে।
﴿ إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ﴾
“যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে লাঞ্ছিত করবেন।”
(সূরা আল-আহযাব: ৫৭)
পুরাতন গ্রন্থ থেকে আরো হাওলা:
ইমাম আবু আল-ফারাজ (রহ.) ‘আল-মুঝতামা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
"وقد كان من أعظم أسباب الفتنة سب الصحابة، فإنهم أناس صدقوا ما عاهدوا الله عليه"
“সর্বাপেক্ষা বড় ফিতনার কারণ হল সাহাবাদের অপবাদ, কারণ তারা সেই মানুষ যারা আল্লাহর সঙ্গে তাদের শপথ পালন করেছিল।”
(আল-মুঝতামা, পৃষ্ঠা ১৫২, মাকতবা আল-হাদিস, মক্কা, ১৩২৫ হিজরী)
সাহাবাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের দমন ও প্রতিরোধ
ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহ.) তার ‘মাজমা আল-ফাতাওয়া’ (মাকতবা আল-আলমী, দমিশ্ক, ১৪১১ হিজরী) তে বলেন:
"الدفاع عن الصحابة فرض واجب، ولا يجوز لأحد أن يسبهم أو يطعن فيهم."
“সাহাবাদের রক্ষা করাই ফরজ; কারো পক্ষ থেকে তাদের অপবাদ দেওয়া বা সন্দেহ করা গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি আরো বলেন, সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ দ্বীনের প্রতি বিদ্বেষের সমতুল্য।
** সাহাবাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক যে সমস্ত মিথ্যা ও অপপ্রচার করা হয়, তা ইসলামের মূল ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আমাদের কর্তব্য হলো তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, তাদের ইতিহাস ও আদর্শকে সঠিকভাবে জানানো এবং যারা তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়, তাদেরকে যথাযথ জ্ঞান দিয়ে মোকাবেলা করা।
আল্লাহ তাআলা তোমার এই আগ্রহকে কবুল করুন এবং মনের আশা কবুল করুন
ReplyDelete