আল্লাহর অশেষ রহমত

আল্লাহর রহমত অশেষ — কতটুকু, কীভাবে এবং কেন

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

 আল্লাহ তা‘আলার সবচেয়ে মহিমান্বিত গুণগুলোর একটি হলো তাঁর রহমত। ইসলামে আল্লাহর পরিচয়ের শুরুই হয় রহমতের মাধ্যমে। পবিত্র কুরআনের প্রতিটি সূরা (তওবা ব্যতীত) শুরু হয়েছে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” দিয়ে। এখানে “রাহমান” ও “রাহিম” — উভয়ই রহমতের গুণবাচক নাম। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি সীমাহীন দয়া ও অনুগ্রহশীল। আল্লাহ বলেন:

وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ
অর্থ: “আমার রহমত সব কিছুকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে।” (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৫৬) এই আয়াতটি আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে আল্লাহর রহমত কোনো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। তা মানুষ, পশু, জিন, আসমান-জমিন—সকল সৃষ্টিকে আচ্ছাদিত করে আছে। এমনকি অবাধ্য ও গুনাহগার বান্দারাও তাঁর রহমত থেকে বঞ্চিত নয়। আল্লাহর রহমতের ব্যাপ্তি বোঝাতে আরেকটি আয়াতে তিনি বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ
অর্থ: “হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” (সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩) এখানে আল্লাহ এমন বান্দাদেরকেও ডেকেছেন যারা সীমালঙ্ঘন করেছে, গুনাহে লিপ্ত হয়েছে। তাদেরকেও তিনি নিরাশ হতে নিষেধ করেছেন। যদি আল্লাহর রহমত সীমিত হতো, তবে এত বড় আহ্বান দেওয়া হতো না। রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর রহমতের পরিমাণ বোঝাতে একটি বিস্ময়কর হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:
إِنَّ لِلَّهِ مِائَةَ رَحْمَةٍ، أَنْزَلَ مِنْهَا رَحْمَةً وَاحِدَةً بَيْنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ وَالْبَهَائِمِ وَالْهَوَامِّ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহর একশত রহমত রয়েছে। তিনি এর মধ্য থেকে একটি রহমত দুনিয়ায় নাযিল করেছেন, যার মাধ্যমে জিন, মানুষ, পশু-পাখি পরস্পরের প্রতি দয়া করে। আর নিরানব্বইটি রহমত তিনি কিয়ামতের দিনের জন্য রেখে দিয়েছেন।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, পৃথিবীতে আমরা যত দয়া-মায়া, ভালোবাসা, মমতা দেখি—সবই আল্লাহর রহমতের মাত্র এক ভাগ। মায়ের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, অপরিচিত মানুষের সহানুভূতি, পশুর সন্তানের প্রতি মায়া—সবই সেই এক অংশের প্রকাশ। তাহলে আখিরাতে অবশিষ্ট নিরানব্বই অংশ কত বিশাল হতে পারে—তা মানুষের কল্পনারও অতীত। আল্লাহর রহমত শুধু আখিরাতে নয়, দুনিয়াতেও নানাভাবে প্রকাশ পায়। মানুষের জীবনে প্রতিদিন অসংখ্য নিয়ামত আসে—বাতাস, পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, ঘুম, জ্ঞান, পরিবার—এসব কিছুই রহমতের ফল। আল্লাহ বলেন:
وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا
অর্থ: “তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, কখনো তা গুনে শেষ করতে পারবে না।” (সূরা ইবরাহীম ১৪:৩৪) নিয়ামত ও রহমত একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রতিটি নিয়ামতের পেছনে রয়েছে আল্লাহর রহমত। আল্লাহর রহমতের আরেকটি বড় দিক হলো—গুনাহ ক্ষমা করা। মানুষ ভুল করে, পাপ করে, সীমালঙ্ঘন করে। তবুও আল্লাহ ক্ষমার দরজা খোলা রেখেছেন। রাসূল ﷺ বলেছেন:
لَلَّهُ أَفْرَحُ بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ مِنْ أَحَدِكُمْ بِضَالَّتِهِ
অর্থ: “আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় তোমাদের কারো হারানো বস্তু ফিরে পাওয়ার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন।” (সহিহ মুসলিম) এটি কল্পনা করাও কঠিন যে, সৃষ্টিকর্তা তাঁর অবাধ্য বান্দার তওবায় আনন্দিত হন। এটি রহমতের সর্বোচ্চ প্রকাশ। আল্লাহর রহমত কখনো মানুষের গুনাহের চেয়ে ছোট নয়। বরং হাদিসে এসেছে:
إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي
অর্থ: “নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর প্রাধান্য লাভ করেছে।” (সহিহ বুখারি) অর্থাৎ আল্লাহর শাস্তি আছে, কিন্তু তাঁর রহমত তা অতিক্রম করে গেছে। বান্দা যদি এক কদম এগিয়ে আসে, আল্লাহ তার দিকে বহুগুণে এগিয়ে আসেন। আল্লাহর রহমত শুধু ধার্মিকদের জন্য নয়; কাফিররাও দুনিয়ায় তাঁর রহমত থেকে উপকৃত হয়। তারা খাদ্য পায়, স্বাস্থ্য পায়, সন্তান পায়। এটি সাধারণ রহমত (رحمة عامة)। আর বিশেষ রহমত (رحمة خاصة) হলো ঈমান, হিদায়াত, ক্ষমা ও জান্নাত—যা মুমিনদের জন্য সংরক্ষিত। কতটুকু রহমত? এর পরিমাণ পরিমাপযোগ্য নয়। এটি সীমাহীন। মানুষের জ্ঞান সীমিত, কিন্তু আল্লাহর রহমত অসীম। আসমান-জমিন যত বড়, তার চেয়েও বড় আল্লাহর দয়া। আল্লাহ বলেন:
رَبُّكُمْ ذُو رَحْمَةٍ وَاسِعَةٍ
অর্থ: “তোমাদের রব ব্যাপক রহমতের অধিকারী।” (সূরা আল-আন‘আম ৬:১৪৭) এই রহমত অর্জনের উপায়ও আছে। ঈমান, তওবা, তাকওয়া, দোয়া, সদকা—এসব আমল রহমত লাভের মাধ্যম। কুরআনে বলা হয়েছে:
إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।” (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৫৬) অতএব, আল্লাহর রহমত অশেষ—তার পরিমাণ মানুষের ধারণার বাইরে। এটি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে বিস্তৃত। গুনাহগার থেকে সাধু, ধনী থেকে গরিব—সবাই তাঁর রহমতের ছায়ায় বেঁচে আছে। তবে বিশেষ রহমত পেতে হলে ঈমান ও নেক আমল জরুরি। সবশেষে আমরা এ দোয়া করি—
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
অর্থ: “হে আমাদের রব! হিদায়াত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরকে বক্র করো না এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করো; নিশ্চয়ই তুমি মহাদাতা।” (সূরা আলে ইমরান ৩:৮) আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর অশেষ রহমতের ছায়ায় রাখুন। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি