আল্লাহর উপর ভরসা (التوكل على الله) – অর্থ, গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও ফজিলত

আল্লাহর উপর ভরসা (التوكل على الله) – অর্থ, গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও ফজিলত

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা (দ্বীনের দ্বীপ্তি)

মানুষের জীবন সংগ্রামময়। কখনো সুখ, কখনো দুঃখ; কখনো সাফল্য, কখনো ব্যর্থতা। এই ওঠা-নামার মাঝেই মুমিনের শক্তি হলো আল্লাহর উপর ভরসা। ইসলামে এটিকে বলা হয় তাওয়াক্কুল (التوكل)। এটি শুধু একটি মানসিক অবস্থা নয়; বরং ঈমানের গভীরতম স্তম্ভগুলোর একটি।

তাওয়াক্কুলের অর্থ কী?

আরবি “توكل” শব্দটি “وكل” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো কাউকে প্রতিনিধি বা ভরসার জায়গা বানানো। তাওয়াক্কুল অর্থ: সব ধরনের চেষ্টা করার পর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর উপর পূর্ণ নির্ভর করা

এটি আলস্য নয়, কাজ ছেড়ে বসে থাকা নয়। বরং চেষ্টা,  দোয়া,বিশ্বাস এরপর তাওয়াক্কুল।

কুরআনের আলোকে তাওয়াক্কুল

১. আল্লাহই যথেষ্ট

قال الله تعالى:

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ

(সূরা الطلاق 65:3) অর্থ: “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।”

এ আয়াত স্পষ্ট ঘোষণা দেয় — মানুষের ভরসা যদি আল্লাহর উপর হয়, তাহলে অন্য কারো উপর নির্ভরতার প্রয়োজন নেই।

২. মুমিনদের বৈশিষ্ট্য

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ ... وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

(সূরা الأنفال 8:2) অর্থ: “মুমিন তো তারাই, যারা আল্লাহর উপরই ভরসা করে।”

এখানে বোঝানো হয়েছে—তাওয়াক্কুল ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

৩. নবীদের শিক্ষা

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ

(সূরা آل عمران 3:173) অর্থ: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।”

এই দোয়া কঠিন পরিস্থিতিতে সাহাবায়ে কেরাম পড়তেন।

হাদিসে তাওয়াক্কুল

১. পাখির উদাহরণ

قال رسول الله ﷺ:

لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ، لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ، تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا

(তিরমিযি) অর্থ: “তোমরা যদি আল্লাহর উপর যথাযথ ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদেরকে রিযিক দিতেন যেমন পাখিদের দেন—তারা সকালে খালি পেটে বের হয়, সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।”

এখানে লক্ষ্য করুন—পাখি বাসায় বসে থাকে না; বের হয়। অর্থাৎ চেষ্টা করতে হয়।

২. উট বেঁধে তাওয়াক্কুল

এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল: আমি কি উট ছেড়ে রেখে তাওয়াক্কুল করবো? নবী ﷺ বললেন:

اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ

অর্থ: “আগে বেঁধে রাখ, তারপর তাওয়াক্কুল কর।” (তিরমিযি)

এ হাদিস তাওয়াক্কুলের সঠিক ভারসাম্য শেখায়।

কেন তাওয়াক্কুল জরুরি?

১. মানসিক শান্তির জন্য

তাওয়াক্কুল হৃদয়ে প্রশান্তি আনে। যখন মানুষ জানে ফলাফল আল্লাহর হাতে, তখন দুশ্চিন্তা কমে যায়।

২. বিপদে ধৈর্য

বিপদে হতাশ না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা সম্ভব হয়।

৩. অহংকার থেকে মুক্তি

সাফল্য এলে মানুষ ভাবে—আমি করেছি। তাওয়াক্কুল শেখায়—আল্লাহ দিয়েছেন।

৪. গুনাহ থেকে বাঁচা

রিযিকের জন্য হারাম পথে না যাওয়ার শক্তি আসে।

তাওয়াক্কুলের ফায়দা

  • রিযিকের নিশ্চয়তা
  • দুশ্চিন্তা হ্রাস
  • সাহস বৃদ্ধি
  • আল্লাহর সাহায্য লাভ
  • আখিরাতে উচ্চ মর্যাদা

কিভাবে তাওয়াক্কুল অর্জন করা যায়?

১. আল্লাহর গুণাবলি জানা

যিনি الرزاق (রিযিকদাতা), القادر (সর্বশক্তিমান), الحكيم (প্রজ্ঞাময়)—তাঁর উপর ভরসা সহজ হয়।

২. নিয়মিত দোয়া

اللَّهُمَّ إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَيْكَ

৩. কুরআন তিলাওয়াত

কুরআন তাওয়াক্কুলকে শক্তিশালী করে।

৪. অতীতের অভিজ্ঞতা স্মরণ

আগে কত বিপদ থেকে আল্লাহ বাঁচিয়েছেন—এটি মনে রাখা।

দুনিয়া ও আখিরাতে তাওয়াক্কুলের ফল

দুনিয়ায়: শান্তি, সাহস, স্থিরতা। আখিরাতে: জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা।

হাদিসে এসেছে—

يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مِنْ أُمَّتِي سَبْعُونَ أَلْفًا بِغَيْرِ حِسَابٍ

(বুখারি, মুসলিম) এরা সেই লোক, যারা আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করা।

তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ফলাফল আল্লাহর হাতে সঁপে দেওয়া। এটি মুমিনের ঢাল, শক্তি, সাহস ও প্রশান্তির উৎস।

আমরা যেন সব কাজে বলি:

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ

আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি