রমজানের বিরতিতে মাদ্রাসার তালেবে ইলমের করণীয়

রমজানের বিরতিতে মাদ্রাসার তালেবে ইলমের করণীয়

এসো ঈযাফি মুতালাআয় নিজেকে ব্যস্ত রাখি

আমরা যারা মাদ্রাসার তালেবে ইলম, আমাদের জীবনে রমজানের বিরতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়টি যেমন হতে পারে আত্মগঠনের সুবর্ণ সুযোগ, তেমনি অবহেলার কারণে এটি হয়ে উঠতে পারে ইলম ও আমলের ক্ষতির কারণ। আজকের এই আলোচনাটি মূলত তাদের জন্য, যারা রমজানের বিরতিতে মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে চলে এসেছেন।

যারা বিভিন্ন জায়গায় কোর্স করছেন, নির্দিষ্ট কোনো কাজে ব্যস্ত আছেন—তাদের কথা ভিন্ন। কিন্তু আমরা যারা বাড়িতে অবস্থান করছি, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় শত্রু হলো শয়তানের ধোঁকা। এই ধোঁকা কখনো অলসতার নামে আসে, কখনো অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ছদ্মবেশে আসে, আবার কখনো “এখন ছুটি, পরে দেখা যাবে”—এই চিন্তার মাধ্যমে আসে।

এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে মাদ্রাসায় যে ইলম অর্জন করেছি, তা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে। ইবারতের স্বাদ কমে যায়, পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়, এবং অজান্তেই সময় নষ্ট হতে থাকে। অথচ সময় নষ্ট মানেই জীবন নষ্টের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।

আমাদের মাঝে কেউ মিজান পড়ি, কেউ নাহবেমির, কেউ হেদায়াতুন্নাহু, কেউ কাফিয়া, কেউ শরহে বেকায়া, আবার কেউ জালালাইন বা মিশকাত-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কিতাবে অধ্যয়নরত। এই প্রতিটি স্তরের তালেবে ইলমের জন্য বিরতির সময়টি ভিন্ন ভিন্নভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাড়িতে এসে আমাদের উচিত একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করা। কোন সময়ে কুরআন তেলাওয়াত করব, কখন কিতাব মুতালাআ করব, কখন বিশ্রাম নেব—সবকিছু যেন নির্দিষ্ট থাকে। কারণ রুটিন ছাড়া জীবন চলে এলোমেলো পথে।

একই সঙ্গে আমাদের কিছু বিষয় বর্জন করাও জরুরি। অপ্রয়োজনীয় আড্ডা, অনর্থক ঘোরাঘুরি, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার—এসব থেকে নিজেকে সংযত রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমরা সাধারণ ছাত্র নই; আমরা তালেবে ইলম। আমাদের সময়, আমাদের চিন্তা—সবকিছুর হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে।

ইনশাআল্লাহ, ধাপে ধাপে এই বিষয়ে আরও করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় আমরা আলোচনা করব। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সময়ের সঠিক কদর করার তৌফিক দান করেন এবং এই রমজানের বিরতিকে আমাদের ইলম ও আমলের জন্য বরকতময় করে দেন।

আমীন।

বিরতির সময় মুতালাআ: তালেবে ইলমের জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব

আমরা যে জামাতেই অধ্যয়নরত থাকি না কেন—মিজান, নাহবেমির, কাফিয়া কিংবা তার ঊর্ধ্বের কোনো স্তরে— বাড়িতে এসে সময় নষ্ট করা আমাদের জন্য কোনোভাবেই শোভন নয়। তালেবে ইলমের পরিচয় হলো, সে সব অবস্থায় ইলমের সাথে যুক্ত থাকে। এইজন্য বাড়িতে এসেও প্রত্যেককেই নির্দিষ্ট সময় বের করে মুতালাআ করতে হবে।

আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো—নিজ নিজ ওস্তাদের সাথে যোগাযোগ করা। ফোন করে বা অন্য কোনো মাধ্যমে ওস্তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে, এই সময়ে কোন কিতাব পড়লে সবচেয়ে বেশি উপকার হবে। কারণ তালেবে ইলম নিজে সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, আর ওস্তাদের নছিহত ইলমে বরকতের দরজা খুলে দেয়।

এমন যেন কখনো না হয়—বিরতির পুরো সময় শেষ হয়ে গেল, অথচ কিতাবের সাথে আমাদের সম্পর্কই তৈরি হলো না। দিনের পর দিন কেটে গেল, কিন্তু মুতালাআর জন্য সামান্য সময়ও দেওয়া হলো না। বরং আমাদের সংকল্প হতে হবে—মাদ্রাসা ছুটি থাকলেও ইলমের ছুটি নেই।

অনেক তালেবে ইলম আক্ষেপ করে বলে—“বাড়িতে এসে কী পড়ব? কোন কিতাব মুতালাআ করব, বুঝে উঠতে পারি না।” আসলে এটি চিন্তার অভাব নয়, বরং পরিকল্পনার অভাব। ইলমের জগতে এমন অসংখ্য কিতাব রয়েছে, যেগুলো আমাদের পড়তেই হবে—আজ না হোক, কাল।

শুধুমাত্র দরসের কিতাবের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখলে ইলম কখনো পরিপূর্ণতা লাভ করে না। দরসের কিতাব আমাদের ভিত্তি তৈরি করে, কিন্তু দরসের বাইরের কিতাবই আমাদের যোগ্যতা, গভীরতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে। এই অতিরিক্ত মুতালাআ ছাড়া কঠিন কিতাব দখলে আসে না এবং ইলমে পোক্ততা সৃষ্টি হয় না।

তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— কোন কিতাব পড়ব, তা যেন নিজের খেয়াল-খুশিমতো না হয়। বরং অবশ্যই ওস্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে। কারণ অনুপযুক্ত কিতাব অনেক সময় উপকারের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে আমরা যারা নিচের জামাতে আছি— যেমন মিজান বা নাহবেমির জামাতে— আমাদের জন্য বিরতির সময়টি এক অমূল্য সুযোগ। মাদ্রাসায় অবস্থানকালে দরসের চাপে দরসের বাইরের কিতাব পড়ার সুযোগ খুব কমই হয়ে ওঠে। আর সুযোগ হলেও দরসের কিতাব আয়ত্ত করতেই অধিকাংশ সময় শেষ হয়ে যায়।

এইজন্য বিরতির সময়গুলোকে আমাদের অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। আজ আমরা যদি এই সময়ের কদর করি, তাহলে আগামী দিনে ইলমের ময়দানে আমাদের অগ্রযাত্রা অনেক সহজ হয়ে যাবে।

ইনশাআল্লাহ।

বাড়িতে অবস্থানকালে মুতালাআ ও দক্ষতা বৃদ্ধির বাস্তব করণীয়

তালেবে ইলমের জন্য বাড়িতে অবস্থানকাল শুধু বিশ্রামের সময় নয়; বরং এটি আত্মগঠন ও যোগ্যতা বৃদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ। এই সময়ে আমরা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কিতাব মুতালাআ করতে পারি, যেগুলো আমাদের চিন্তা, দৃষ্টি ও লক্ষ্যের দিকনির্দেশনা দিবে।

এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো “তালেবে ইলম: পথ ও পাথেয়”— হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মালেক সাহেব হুজুর (দা.বা.) রচিত। এই কিতাবটি একজন তালেবে ইলমকে কীভাবে চিন্তা করতে হবে, কীভাবে সময়কে কাজে লাগাতে হবে এবং ইলম অর্জনের পথে কোন বিষয়গুলো জরুরি— তা অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ও বাস্তব ভাষায় তুলে ধরে।

এছাড়াও আমরা পড়তে পারি “শিক্ষার্থীদের সফলতার রাজপথ”— মাওলানা সফিউল্লাহ ফুয়াদ সাহেব হুজুরের এই কিতাবটি। এটি শিক্ষার্থীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, লক্ষ্য নির্ধারণ ও সফল জীবনের প্রস্তুতি নিতে বিশেষভাবে সহায়ক।

আরেকটি অত্যন্ত উপকারী কাজ হলো— আমরা দরসে যেসব কিতাব পড়েছি, সেগুলো নতুন করে আবার পড়া। দ্বিতীয়বার মুতালাআ করলে কিতাবের অনেক সূক্ষ্ম বিষয় স্পষ্ট হয় এবং আয়ত্ত বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

বাড়িতে এসে আমরা আমাদের লেখার মান উন্নত করার দিকেও মনোযোগ দিতে পারি। যাদের এখনো লেখা সুন্দর হয়ে ওঠেনি, তারা এই সময়ে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেদের হাতের লেখা সুন্দর করতে পারে। বিশেষ করে আরবি ও বাংলা— এই দুই ভাষায় সুন্দর ও পরিষ্কার লেখা একজন তালেবে ইলমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যারা এই বছর নাহবেমির জামাতে পড়েছি, তারা দরসের বাইরেও অন্তত দুইটি নাহুর কিতাব মুতালাআ করতে পারি। যারা এখনো “এসো নাহু শিখি” কিতাবটি পড়িনি, তারা অবশ্যই এটি পড়ে নেব। এটি নাহুর ভিত্তি মজবুত করার জন্য খুবই সহায়ক।

একইভাবে, যারা কোনো কারণে নাহবেমির কিতাবটি পড়েনি, তারা এই সুযোগে সেটিও পড়ে নিতে পারে। কারণ একেক মাদ্রাসায় একেক কিতাব পড়ানো হয়। বাড়িতে এসে আমরা যদি সেই কিতাবগুলোও পড়ে নেই, যেগুলো আমাদের মাদ্রাসায় পড়ানো হয়নি, তাহলে অন্যান্য মাদ্রাসার পাঠ্যসূচির সাথেও আমাদের পরিচয় হয়ে যাবে।

আরবি ভাষার উন্নতির জন্য আমরা কিছু আরবি সাহিত্য কিতাবও পড়তে পারি। এর মধ্যে “কাসাসুন নাবিয়্যিন” অত্যন্ত উপকারী। এছাড়াও আদিব হুজুর রচিত কিতাব পড়লে আমরা শিখতে পারি— কিভাবে তরজমা করতে হয়, কিভাবে তারকিব সাজাতে হয় এবং কিভাবে সুন্দর বাক্য গঠন করা যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হলো— প্রতিদিন অল্প অল্প করে আরবি রোজনামচা লেখা। এই অভ্যাস আমাদের আরবি যোগ্যতা গড়ে তুলবে। নচেৎ এই দীর্ঘ সময় যদি আরবির সাথে আমাদের সম্পর্ক না থাকে, তাহলে মাদ্রাসায় ফিরে গিয়ে সবকিছু অচেনা ও অন্ধকার মনে হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সময়ের কদর করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

বিরতির সময় ইলমী অগ্রগতির বাস্তব দিকনির্দেশনা

এইজন্য প্রতিদিন অল্প হলেও আমাদের আরবি রোজনামচা লেখা অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। প্রতিদিনের অনুভূতি, কাজকর্ম বা চিন্তা— দু-চারটি বাক্য হলেও আরবিতে লিখতে পারলে আরবি ভাষার সাথে আমাদের সম্পর্ক অটুট থাকবে।

এছাড়াও কিছু উপকারী ও হৃদয়জাগানিয়া কিতাব রয়েছে— যেগুলো পড়লে আমাদের সময়ও কাজে লাগবে এবং ইলমের দিক থেকেও আমরা সমৃদ্ধ হব। যেমন— “এসো কলম মেরামত করি”, “জীবন পথের পাথেয়”, “সিরাতে আয়েশা (রা.)”, “নবী জীবনের বাঁকে বাঁকে”, “তোমাকে ভালোবাসি হে নবী ﷺ”। এই কিতাবগুলো সংগ্রহ করে নিয়মিত মুতালাআ করলে আমাদের চিন্তা-চেতনা শুদ্ধ হবে এবং দ্বীনের সাথে সম্পর্ক গভীর হবে।

এইভাবে পরিকল্পিতভাবে পড়াশোনা করলে আমরা অন্যদের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারব— ইলমে, আমলে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে।

এরপর যারা এই বছর হেদায়াতুন্নাহু বা কাফিয়া জামাতে পড়েছি, তাদের জন্য তো সুযোগ আরো বেশি। আমরা অবশ্যই আমাদের ওস্তাদদের সাথে যোগাযোগ করে পরামর্শ অনুযায়ী কিতাব নির্বাচন করব এবং সেই অনুযায়ী পড়াশোনা করব।

আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— প্রতিমাসে প্রকাশিত আল-কাউসার পত্রিকা। এর মধ্যে “শিক্ষার্থীদের পাতা” নামে একটি মূল্যবান অংশ রয়েছে, যা বিশেষভাবে তালেবে ইলমদের জন্য লেখা। এই অংশগুলো আমরা নিয়মিত পড়তে পারি।

২০০৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত (২০২৫ সাল পর্যন্ত) আল-কাউসার নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। এই দীর্ঘ সময়ে হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মালেক সাহেব হুজুর (দা.বা.) তালেবে ইলমদের উদ্দেশ্যে যেসব প্রবন্ধ লিখেছেন— সেগুলো একত্রে পড়লে আমাদের মানসিকতা, লক্ষ্য ও ইলমী দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে বদলে যেতে পারে।

ইনশাআল্লাহ, এর মাধ্যমে আমাদের মাঝে ইলমের তলব সৃষ্টি হবে। আমরা বুঝতে পারব— ইলম আসলে কী, কেন ইলম শিখছি এবং কিভাবে ইলমকে জীবনের সাথে যুক্ত করতে হয়।

যারা নাহবেমির জামাতে পড়েছি, তারা এই বিরতিতে النحو الواضح কিতাবটি পড়তে পারি। এটি নাহুর ভিত্তি মজবুত করার জন্য অত্যন্ত কার্যকর।

আর যারা উপরের জামাতে উঠে تلخيص المفتاح পড়েছি, তারা এর সাথে الطريق إلى البلاغةالبلاغة الواضحة এই কিতাবগুলো মুতালাআ করতে পারি। এর মাধ্যমে আমাদের বালাগাতের জ্ঞান গভীর হবে এবং আরবি সাহিত্য বোঝার যোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সময়ের সদ্ব্যবহার করার তাওফিক দান করুন, ইলমের প্রতি মহব্বত ও তলব পয়দা করে দিন। আমিন।

উপরের জামাতের তালেবে ইলমদের জন্য বিশেষ মুতালাআ তালিকা

বিরতির সময় আমরা বাড়িতে এসে আরো কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরবি কিতাব মুতালাআয় রাখতে পারি। বিশেষত যারা উপরের জামাতে পড়ি, তাদের জন্য এই কিতাবগুলো ইলমী পরিপক্বতা অর্জনের ক্ষেত্রে খুবই সহায়ক।

যেমন— قيمة الزمان عند العلماء (ওলামায়ে কেরামের কাছে সময়ের মূল্য), رسالة المسترشدين, رحمة للعالمين (কাযী সুলায়মান মানসুরপুরী রহ.), نور البصر في سيرة خير البشر, এবং السيرة النبوية। এই কিতাবগুলো পড়লে আমাদের সময়ানুবর্তিতা, সিরাত-চেতনা এবং দ্বীনি অনুভূতি গভীর হবে।

যারা শরহে বেকায়া জামাতে আছি কিন্তু এখনো تسهيل الأصول কিতাবটি মুতালাআ করিনি, তারা এই বিরতিতে এটি পড়ার চেষ্টা করতে পারি। উসূলের বুনিয়াদ মজবুত করার জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী।

আর যারা মেশকাত পড়েছি, তারা تاريخ المذاهب الإسلامية কিতাবটি মুতালাআ করতে পারি। এতে মাজহাবের ইতিহাস ও ফিকহি বিকাশ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হবে।

যারা হেদায়াতুন্নাহু জামাতে আছি, তাদের জন্য زاد الطالبين একটি সহজ ও উপকারী কিতাব। আর যারা হেদায়া জামাত পড়েছি, তারা آثار السنن মুতালাআ করতে পারি।

এছাড়াও التوضيحالتلويح— এই দুইটি কিতাব মুতালাআ করলে উসূলুল ফিকহে আমাদের দক্ষতা আরো বৃদ্ধি পাবে।

আকাবির ওলামায়ে কেরামের জীবনী পাঠ

এই বিরতিতে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো— আকাবির ওলামায়ে কেরামের জীবনী পড়া। কারণ তাঁদের জীবনেই লুকিয়ে আছে আমাদের জন্য পাথেয়, প্রেরণা ও চলার শক্তি।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ হলো আপবিতি পড়া। এর উর্দু সংস্করণ রয়েছে, এবং আলহামদুলিল্লাহ বাংলা অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা অনুবাদ সংগ্রহ করে পড়লে খুবই ফায়দা হবে ইনশাআল্লাহ।

আমরা পড়তে পারি— হযরত আশরাফ আলী থানভী রহ., হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ., হযরত শামসুল হক ফরিদপুরী রহ., হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদবী রহ. এবং অন্যান্য আকাবিরদের জীবনী ও স্মৃতিচারণ।

এছাড়াও মুফতি তাকি ওসমানী সাহেব হুজুরের জীবননামা, যা আদীব হুজুর অনুবাদ করেছেন— “কিছু কথা কিছু স্মৃতি”— এই কিতাবটি আমরা অবশ্যই পড়তে পারি।

আদীব হুজুরের কিতাবসমূহ

এরপর আদীব হুজুরের মূল্যবান কিছু কিতাব রয়েছে— বাইতুল্লাহর মুসাফির, বাইতুল্লাহর ছায়া, ইসলামকে জানতে হলে, দরদী মালির কথা শোনো (১–৩), পুষ্প সমগ্রসহ হযরতের লিখিত অন্যান্য কিতাব। এসব কিতাব মুতালাআ করলে আমাদের চিন্তা, রুচি ও দাওয়াতী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠবে।

আল্লাহ তাআলা এই বিরতিকে আমাদের জন্য ইলমী উন্নতির সুবর্ণ সুযোগ বানিয়ে দিন। আমিন।

ছোট জামাতের তালেবে ইলমদের জন্য উপযোগী মুতালাআ

আমরা যারা এখনো ছোট জামাতে আছি, বিশেষ করে তাইসির জামাতে পড়ি, তাদের জন্যও বিরতির সময় একেবারেই হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। আমাদের যোগ্যতা অনুযায়ী, বয়স ও মেধার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কিতাব রয়েছে, যেগুলো পড়লে আকীদা, আমল ও চিন্তাধারা সুন্দরভাবে গড়ে উঠবে।

এই পর্যায়ে আমরা পড়তে পারি আদীব হুজুর রচিত ছোটদের আকীদা সিলসিলার মোট ১০টি কিতাব। এগুলো অত্যন্ত সহজ ভাষায় লিখিত, কিন্তু আকীদার বুনিয়াদ মজবুত করার জন্য খুবই কার্যকর।

এর পাশাপাশি ফাযায়েল সিরিজের ৪টি কিতাব পড়লে আমাদের আমলের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে, ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা জন্মাবে এবং দ্বীনের সৌন্দর্য হৃদয়ে গেঁথে যাবে।

নাহবেমির ও তার উপরের জামাতের জন্য

যারা নাহবেমির জামাত পড়েছি, তারা এই বিরতিতে “ইসলাম ক্যায়া হে” কিতাবটি পড়তে পারি। এই কিতাবটি ইসলাম সম্পর্কে একটি সমন্বিত ধারণা দেয় এবং চিন্তার জগৎকে পরিষ্কার করে।

এর উপরের জামাতে যারা পড়ি, তারা নিম্নোক্ত কিতাবগুলো মুতালাআয় রাখতে পারি—

  • حياة المسلمين
  • آپ کون ہیں، کیا ہیں، آپ کا منزل کیا ہے
  • من أدب الإسلام
  • آداب المعاشرة
  • تعليم الدين
  • قرآن آپ سے کیا کہتا ہے
  • ذکر و فکر
  • دین و شریعت

এই কিতাবগুলো পড়লে একজন তালেবে ইলম হিসেবে আমাদের চিন্তা-চেতনা পরিশুদ্ধ হবে, আখলাক উন্নত হবে এবং দ্বীনের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত হবে।

গভীর চিন্তামূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ কিতাবসমূহ

একটি অত্যন্ত সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ বাংলা কিতাব হলো— “ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধ” —হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আবুল বাশার মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দা.বা.। এই কিতাবটি পড়লে উগ্রতা ও শিথিলতার মাঝখানে ইসলামের সঠিক অবস্থান বুঝতে সহজ হয়।

এছাড়াও আমরা পড়তে পারি— صفحات من صبر العلماء على شدائد العلم والتحصيل, اختلاف امت اور صراط مستقيم, اکابر دیوبند کیا تھے। এই কিতাবগুলো আমাদের মাঝে ইলমের কদর ও আকাবিরদের পথের প্রতি মহব্বত তৈরি করবে।

ওস্তাদের অনুমতির গুরুত্ব

এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের নাম উল্লেখ করা হলো। তবে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে— আমি যেই কিতাবই পড়ি না কেন, সেটা আমার ওস্তাদে মুহতারামের অনুমতি নিয়েই পড়ব

ওস্তাদ যদি আমাকে অনুমতি দেন, তাহলে আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি তিনি অন্য কোনো কিতাব পড়ার পরামর্শ দেন, তাহলে সেটাই আমার জন্য উত্তম।

কারণ এটি বিরতির সময়— এই সময়কে কাজে লাগানো আমাদের দায়িত্ব। মাদ্রাসায় দরসের চাপের কারণে যে কিতাবগুলোর সাথে সম্পর্ক হয়ে ওঠে না, বিরতিতে সেগুলো পড়ে নেওয়ার এটাই সুবর্ণ সুযোগ।

এর ফলে সময় নষ্ট হবে না, বরং সময় কাজে লাগবে— এবং সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের ইলম ও যোগ্যতা ইনশাআল্লাহ বৃদ্ধি পাবে।

কিতাব নেই—এই প্রশ্নের বাস্তব সমাধান

এখন অনেকের মনে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগতে পারে— আমি যে কিতাবগুলো পড়তে চাই, সেগুলো তো আমার হাতের নাগালে নেই। আমার কাছে নেই। তাহলে আমি কীভাবে পড়ব?

এই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ, কিন্তু বাস্তবতা খুব গভীর। আসলে যদি পড়ার হিম্মত থাকে, যদি অন্তরে ইলমের তলব থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই পড়ার জন্য কোনো না কোনো ব্যবস্থা করে দেন

কিতাব সংগ্রহের বাস্তব উপায়

প্রথমত, আমরা আমাদের আশেপাশের কোনো মাদ্রাসার মাকতাবা বা লাইব্রেরিতে গিয়ে নির্দিষ্ট সময় বসে বসে কিতাব মুতালাআ করতে পারি। অনেক সময় সেখানে এমন কিতাব থাকে, যেগুলো আমাদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে নেই।

দ্বিতীয়ত, কাছাকাছি বা দূরের যেকোনো মাকতাবা (বইয়ের দোকান) থেকে এই কিতাবগুলো সংগ্রহ করা যায়। আজকাল কুরিয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই বই পৌঁছে যায়।

তৃতীয়ত, আমাদের কোনো সাথী ভাই, সহপাঠী বা বড় ভাইয়ের কাছে যদি প্রয়োজনীয় কিতাব থাকে, তাহলে আমরা সেগুলো কিছু দিনের জন্য ধার নিতে পারি। আর যদি দূরত্ব বেশি হয়, তাহলে কুরিয়ারেও পাঠানো সম্ভব।

স্মার্টফোন—নিয়ামত না অপচয়ের মাধ্যম?

এরপরও যদি কোনো কারণে কিতাবের ব্যবস্থা না হয়, তাহলে আমাদের হাতে যদি একটি স্মার্টফোন থাকে— অথবা নিজের না থাকলেও পরিবারের কারো কাছে থাকে— তাহলে আমরা এই কিতাবগুলোর পিডিএফ সংস্করণ নামিয়ে পড়তে পারি।

আজকাল অনেক মূল্যবান কিতাবই পিডিএফ আকারে সহজেই পাওয়া যায়। সুতরাং বই নেই—এই অজুহাত দেখিয়ে সময় নষ্ট করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়

সময় নষ্টের অজুহাত নয়, দায়িত্ববোধ চাই

আমাকে একটি কথা গভীরভাবে মনে রাখতে হবে— আমি যদি আমার মনকে না বুঝাই, তাহলে আমার মনকে আর কে বোঝাবে?

আমি যদি সময় নষ্ট করি, তাহলে এর ক্ষতি অন্য কারো হবে না— ক্ষতিটা হবে শুধু আমার নিজের। আর আমি যদি এই সময়কে কাজে লাগিয়ে কিছু অর্জন করি, তাহলে সেই অর্জনও আমারই থাকবে

আমার সম্মান আমার নিজের হাতে। আবার আমার গাফিলতির কারণে যদি ভবিষ্যতে আমাকে লজ্জিত বা অপমানিত হতে হয়, তাহলেও দায়িত্ব আমারই।

সুতরাং আসুন, এই বিরতির সময়টাকে আমরা কাজে লাগাই। আজকের এই সামান্য মেহনতই আগামী দিনের ইলম, যোগ্যতা ও মর্যাদার ভিত গড়ে দেবে—ইনশাআল্লাহ।

বিরতিতে তালেবে ইলমের আদর্শ জীবনচর্চা

বিরতির সময় বাড়িতে এসে আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো নিজেকে গুনাহমুক্ত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কারণ গুনাহ ইলমের নূরকে নিভিয়ে দেয় এবং অন্তরের শক্তিকে দুর্বল করে দেয়।

এর পাশাপাশি আমাদের উচিত মা-বাবার সর্বাত্মক সহযোগিতা করা। তাদের খেদমত করা, কথা শোনা, প্রয়োজন পূরণ করা— এসব কাজ ইলমের বরকত বাড়িয়ে দেয়।

আমরা পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে সাক্ষাৎ করব, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করব। কারণ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ইলমের পথকে সংকীর্ণ করে দেয়, আর সুসম্পর্ক আল্লাহর রহমত টেনে আনে।

আমল ও ইবাদতের ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া

বাড়িতে থাকাকালীন সময়ে আল্লাহর ইবাদতগুলো সময়মতো আদায় করা আমাদের জন্য খুবই জরুরি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে পড়ার চেষ্টা করব, নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করব এবং সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন আমলগুলো পূর্ণ গুরুত্বের সাথে পালন করব।

সকল মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার ও সুন্দর আখলাক প্রদর্শনের চেষ্টা করব। কারণ একজন তালেবে ইলমের চরিত্রই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।

এভাবে জীবন গুছিয়ে চলতে পারলে— মন ভালো থাকবে, আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন এবং নিয়মিত অধ্যয়নের মাধ্যমে কিতাবের সাথে আমাদের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাবে।

ইলমের জন্য নিরিবিলি ব্যস্ততা

আল্লাহর এমন অনেক নেক বান্দা রয়েছেন, যারা বাড়িতে এসে ইলম অর্জনের জন্য বিশেষ আগ্রহ ও তৃষ্ণা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতেন।

তারা একটি নির্দিষ্ট ঘর বেছে নিতেন— যে ঘরে থাকত শুধু কিতাব আর কিতাব। তাদের সময় কাটত পড়া ও লেখার মধ্যেই। সময়মতো ইবাদত, প্রয়োজন অনুযায়ী খাওয়া-দাওয়া ও অন্যান্য কাজ শেষ করে আবার ফিরে যেতেন কিতাবের জগতে।

এভাবে পড়তে পড়তে তারা বিভিন্ন ফনের কিতাবের নাম, মুসান্নিফদের পরিচয় এবং কিতাবের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতেন।

এই গুরুত্বপূর্ণ ইলমী শাখাটিকে বলা হয়— تعارف الكتب (কিতাব পরিচিতি)।

আসুন, আমরাও এই পথেই চলার চেষ্টা করি। ইনশাআল্লাহ, এই নিয়মিত আমল, আখলাক ও অধ্যয়নই আমাদের ভবিষ্যতের ইলম, যোগ্যতা ও তাকওয়ার ভিত্তি গড়ে দেবে।

ওস্তাদের অনুমতির উপর চলাই তালেবে ইলমের নিরাপদ পথ

সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি আমি আবারও স্পষ্ট করে বলতে চাই, তা হলো— আমি যাই করব, যেই কিতাবই পড়ব, সবকিছুই আমার ওস্তাদের অনুমতি ও পরামর্শ অনুযায়ী করব। আমি নিজ বুঝ, নিজ রুচি কিংবা নিজের ইচ্ছার উপর ভর করে চলব না।

কারণ একজন তালেবে ইলমের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ, কল্যাণকর ও বরকতময় পথ হলো— ওস্তাদের দেখানো পথে চলা। কোন কিতাব আমার জন্য উপযোগী, কোন কিতাব এখন পড়া উচিত, কোনটি পরে পড়লে উপকার হবে—এই সিদ্ধান্ত আমার ওস্তাদই আমার জন্য গ্রহণ করবেন। এটাই আমার জন্য উত্তম এবং এটাই ইলমের আদব।

কিতাব বুঝতে না পারলে করণীয়

মুতালাআ করতে গিয়ে যদি কোথাও বুঝতে সমস্যা হয়, কোন ইবারত আমার কাছে অস্পষ্ট লাগে বা কোন বিষয় হৃদয়ে পরিষ্কারভাবে বসে না— তাহলে আমি কখনোই নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দাঁড় করাবো না, নিজের মন্তব্য সংযোজন করব না।

বরং আমি তখন ওস্তাদের নিকট শরণাপন্ন হব। প্রয়োজনে ফোন করে বিষয়টি জেনে নিব, অথবা কিতাবের সেই অংশে পেন্সিল দিয়ে দাগিয়ে রাখব। একটি খাতায় পৃষ্ঠা নম্বরসহ যে ইবারতটি বুঝতে পারিনি সেটি লিখে রাখব।

পরবর্তীতে যখন মাদ্রাসায় ফিরে যাব, তখন বিনয়ের সাথে আমার ওস্তাদের নিকট সেই বিষয়টি হল করে নিব—ইনশাআল্লাহ। এভাবেই ইলম নিরাপদ থাকে, এভাবেই ভুল বোঝাবুঝি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

দোয়া ও প্রত্যাশা

আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে এই আদব ও মানসিকতার উপর অটল থাকার তৌফিক দান করেন। আমাদের সময়কে যেন উত্তম কাজে ব্যয় করার তৌফিক দান করেন। শয়তানের সকল ধোঁকা ও গাফিলতি থেকে আমাদের হেফাজত করেন।

আল্লাহ আমাদেরকে নিজেদের সম্মান ও দায়িত্ব বুঝার তৌফিক দান করুন, আমাদের অন্তরে ইলমের তলব পয়দা করে দিন, এবং ইলমের নূর দ্বারা আমাদের জীবন আলোকিত করুন।

আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি