কম্পিউটার : ধারণা, গঠন ও আধুনিক জীবনে এর ভূমিকা

কম্পিউটার : ধারণা, গঠন ও আধুনিক জীবনে এর ভূমিকা

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 

বর্তমান যুগকে যদি এক কথায় সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়—এটি প্রযুক্তির যুগ। এই প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে যে যন্ত্রটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে, তা হলো কম্পিউটার। শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, প্রশাসন কিংবা দ্বীনি খেদমত— এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে কম্পিউটারের উপস্থিতি আজ অনুভূত হয় না।

তবুও আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা প্রতিনিয়ত কম্পিউটার ব্যবহার করলেও এর প্রকৃত অর্থ, গঠন ও কার্যকারিতা সম্পর্কে অনেকেই সুস্পষ্ট ধারণা রাখি না। এই প্রবন্ধে আমরা সহজ, সুসংহত ও সাহিত্যসমৃদ্ধ ভাষায় জানার চেষ্টা করব— আসলে কম্পিউটার কী, এর দ্বারা কী কী কাজ করা যায়, এটি কোন কোন যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে গঠিত এবং কীভাবে এটি পরিচালিত হয়।

কম্পিউটার শব্দের অর্থ ও মূল ধারণা

“কম্পিউটার” শব্দটি এসেছে ইংরেজি Compute শব্দ থেকে, যার অর্থ হলো হিসাব করা বা গণনা করা। প্রাথমিকভাবে কম্পিউটার তৈরি করা হয়েছিল জটিল গণনার কাজ সহজ ও দ্রুত করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এই যন্ত্রটি কেবল হিসাবের সীমায় আবদ্ধ থাকেনি; বরং আজ এটি মানুষের চিন্তা, পরিকল্পনা ও সৃজনশীলতার এক শক্তিশালী সহায়কে পরিণত হয়েছে।

সহজভাবে বলা যায়—কম্পিউটার হলো এমন একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যা মানুষের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী তথ্য গ্রহণ করে, সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল প্রদান করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে অত্যন্ত দ্রুত, নির্ভুল ও ধারাবাহিকভাবে।

কম্পিউটারের মাধ্যমে কী কী কাজ করা যায়

কম্পিউটারের কাজের পরিসর এতটাই বিস্তৃত যে তা কয়েকটি বাক্যে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। লেখালেখি থেকে শুরু করে বিশাল তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণ, হিসাব-নিকাশ, ছবি ও ভিডিও সম্পাদনা, ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ—সবই আজ কম্পিউটারের মাধ্যমে সম্ভব।

একজন শিক্ষার্থী কম্পিউটার ব্যবহার করে নোট তৈরি করতে পারে, গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখতে পারে, প্রেজেন্টেশন প্রস্তুত করতে পারে। একজন আলেম বা তালেবে ইলম কম্পিউটারের মাধ্যমে কিতাব টাইপিং, প্রশ্নপত্র প্রস্তুত, দাওয়াহমূলক লেখা সংরক্ষণ এবং অনলাইনে ইলম ছড়িয়ে দিতে পারে।

এছাড়া ব্যবসায়িক হিসাব, ব্যাংকিং কার্যক্রম, চিকিৎসা সংক্রান্ত রিপোর্ট, সরকারি প্রশাসনিক কাজ—সব ক্ষেত্রেই কম্পিউটার আজ অপরিহার্য একটি মাধ্যম।

কম্পিউটারের প্রধান যন্ত্রাংশসমূহ

একটি পূর্ণাঙ্গ কম্পিউটার মূলত কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে গঠিত। এই যন্ত্রাংশগুলো একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো মনিটর, সিপিইউ, কিবোর্ড ও মাউস।

মনিটর

মনিটর হলো কম্পিউটারের পর্দা, যার মাধ্যমে আমরা কম্পিউটারের কাজ দেখতে পাই। কম্পিউটার আমাদের যে তথ্য বা ফলাফল প্রদান করে, তা মনিটরের মাধ্যমেই দৃশ্যমান হয়।

সিপিইউ (CPU)

সিপিইউকে বলা হয় কম্পিউটারের মস্তিষ্ক। এটি মূলত একটি বাক্সের ভেতরে থাকা বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সমষ্টি, যেখানে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের মূল কাজগুলো সম্পন্ন হয়।

সিপিইউর ভেতরে থাকে প্রসেসর, র‍্যাম, হার্ডডিস্ক, কুলিং ফ্যানসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রসেসর যত শক্তিশালী হবে, কম্পিউটার তত দ্রুত ও দক্ষভাবে কাজ করতে পারবে।

কিবোর্ড

কিবোর্ড হলো ইনপুট ডিভাইস, যার মাধ্যমে আমরা কম্পিউটারে লেখা বা নির্দেশ প্রদান করি। অক্ষর, সংখ্যা ও বিভিন্ন চিহ্নের সমন্বয়ে কিবোর্ড কম্পিউটারের সাথে আমাদের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম।

মাউস

মাউসও একটি ইনপুট ডিভাইস। এর সাহায্যে আমরা পর্দায় থাকা বিভিন্ন অপশন নির্বাচন করতে পারি, ফাইল খুলতে পারি এবং কাজকে আরও সহজ ও গতিশীল করে তুলতে পারি।

কম্পিউটারের অভ্যন্তরীণ উপাদানসমূহ

কম্পিউটারের ভেতরের যন্ত্রাংশগুলো সাধারণ চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। র‍্যাম সাময়িকভাবে তথ্য সংরক্ষণ করে, হার্ডডিস্ক স্থায়ীভাবে তথ্য জমা রাখে, আর কুলার বা ফ্যান কম্পিউটারের অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

এই সব উপাদানের সম্মিলিত কাজেই কম্পিউটার দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে সক্ষম হয়।

কম্পিউটার চালু ও বন্ধ করার প্রাথমিক ধারণা

কম্পিউটার ব্যবহার শেখার প্রথম ধাপ হলো এটি সঠিকভাবে চালু ও বন্ধ করতে জানা। পাওয়ার বাটনে চাপ দিয়ে কম্পিউটার চালু করা হয় এবং নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সফটওয়্যার পদ্ধতিতে বন্ধ করা হয়।

হঠাৎ করে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে কম্পিউটার বন্ধ করা যন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সচেতনভাবে ও নিয়ম মেনে কম্পিউটার ব্যবহার করা জরুরি।

কম্পিউটার ও মানবজীবন

আজকের মানবজীবন কম্পিউটার ছাড়া প্রায় অচল। এই যন্ত্রটি আমাদের সময় বাঁচায়, কাজের গতি বাড়ায় এবং চিন্তার পরিধিকে প্রসারিত করে।

যদি আমরা কম্পিউটারকে সঠিক উদ্দেশ্যে, সুশৃঙ্খলভাবে ও নৈতিকতার সীমার মধ্যে ব্যবহার করি, তবে এটি আমাদের জন্য এক বিশাল নিয়ামতে পরিণত হতে পারে।

সুতরাং,,,,

কম্পিউটার কেবল একটি যন্ত্র নয়; এটি আধুনিক সভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর সঠিক ধারণা ও ব্যবহার আমাদেরকে শিক্ষা, কর্ম ও দ্বীনি খেদমতের পথে অনেক দূর এগিয়ে দিতে পারে।

অতএব, সময়ের দাবি বুঝে কম্পিউটার সম্পর্কে প্রাথমিক থেকে গভীর জ্ঞান অর্জন করা আমাদের প্রত্যেকের জন্যই জরুরি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই প্রযুক্তিকে কল্যাণের কাজে ব্যবহার করার তৌফিক দান করুন—আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি