বেফাক পরীক্ষার পর দীর্ঘ বিরতি : আত্মগঠনের সুবর্ণ সুযোগ

 

বেফাক পরীক্ষার পর দীর্ঘ বিরতি : আত্মগঠনের সুবর্ণ সুযোগ

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 
 

আলহামদুলিল্লাহ, মহান আল্লাহ তাআলার অশেষ মেহেরবানিতে আমরা ইতিমধ্যে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-এর অধীনে অনুষ্ঠিত ইবতিদাইয়া জামাত থেকে শুরু করে ফজিলত স্তর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড পরীক্ষাগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি। দীর্ঘ প্রস্তুতি, নিরবচ্ছিন্ন মেহনত, মানসিক চাপ ও শারীরিক কষ্টের পর আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি ও বিরতির ব্যবস্থা করেছেন। এই বিরতি নিঃসন্দেহে তাঁর এক বিশেষ নিয়ামত।

ঈদের পর পর্যন্ত যে দীর্ঘ সময় আমরা হাতে পাচ্ছি, তা নিছক অবসর নয়; বরং এটি আমাদের জীবন, ইলম ও ভবিষ্যৎকে নতুন করে গড়ে তোলার এক সুবর্ণ সুযোগ। প্রশ্ন হলো—এই মূল্যবান সময় কি আমরা অযথা নষ্ট করে দেব, নাকি নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য একে কাজে লাগাব?

নিজেদের দুর্বলতা চিহ্নিত করা : প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

আমাদের অনেক তালেবে ইলমের মাঝেই কিছু সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা বিদ্যমান। বিশেষ করে নাহু ও সরফ—যা আরবি ভাষার মেরুদণ্ড—এই দুই শাস্ত্রে অনেকেই আশানুরূপ দক্ষতা অর্জন করতে পারিনি। শুদ্ধভাবে ইবারত পড়া, ইরাব বোঝা, সরফি বিশ্লেষণ করা—এসব ক্ষেত্রে এখনো বহু তালেবে ইলম পিছিয়ে আছে।

আবার অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, আরবি সাহিত্য পড়তে গিয়ে ভয় কাজ করে। আদবি রুচি গড়ে ওঠেনি, শব্দভাণ্ডার দুর্বল, ভাবার্থ ধরতে কষ্ট হয়। এসব দুর্বলতা উপেক্ষা করে সামনে এগোনো সম্ভব নয়।

লম্বা বিরতিতে তাদরিব ও কোর্স : দুর্বলতা কাটানোর বাস্তব পথ

এই দীর্ঘ বিরতিতে আমরা চাইলে কোনো একটি ভালো, নির্ভরযোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানে নাহু-সরফ, শুদ্ধ ইবারত পাঠ কিংবা আরবি সাহিত্য বিষয়ক বিশেষ তাদরিব বা কোর্সে অংশগ্রহণ করতে পারি। সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই এই দুর্বলতাগুলো অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

পাশাপাশি আমাদের মধ্যে যারা অন্তত জালালাইন জামাত শেষ করেছি, তাদের অনেকের হৃদয়ে উচ্চতর ইলমের প্রতি বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকে আশা রাখি—এই বিরতিতে কিছু সময় ব্যয় করে উলুমুল হাদিসের তাদরিব অথবা উসূলুল ফিকহ-এর প্রাথমিক ও প্রয়োগমূলক প্রশিক্ষণে যুক্ত হব।

আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের তাদরিবের সুব্যবস্থা রয়েছে। সঠিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করে, নিজ যোগ্যতা ও প্রস্তুতির আলোকে এগুলোতে অংশগ্রহণ করলে ইনশাআল্লাহ ইলমি জীবনে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।

হাতের লেখা, ভাষা ও আধুনিক দক্ষতা

আমাদের আরেকটি সাধারণ দুর্বলতা হলো হাতের লেখা। অনেকের আরবি, বাংলা কিংবা উর্দু লেখা পরিষ্কার ও সুন্দর নয়, যা পড়াশোনা ও পরীক্ষায় বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই বিরতিতে আমরা চাইলে কিছু সময় ব্যয় করে বাংলা, আরবি ও উর্দু হাতের লেখা উন্নয়ন কোর্সে অংশ নিতে পারি। সুন্দর হাতের লেখা শুধু দৃষ্টিনন্দনই নয়, বরং ইলমি জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

অনেক তালেবে ইলমের মাঝে ইংরেজি ভাষা শেখার আগ্রহও লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান সময়ে ইংরেজির প্রাথমিক দক্ষতা ইলমি কাজ, গবেষণা ও যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুতরাং সীমিত পরিসরে হলেও ইংরেজি শেখার পেছনে কিছু সময় ব্যয় করা যেতে পারে।

একইভাবে কম্পিউটার শিক্ষা—বিশেষ করে বেসিক কম্পিউটার স্কিল— আজকের যুগে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ডকুমেন্ট টাইপিং, প্রেজেন্টেশন, অনলাইন রিসোর্স ব্যবহার—এসব বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া আমাদের ভবিষ্যতের জন্য উপকারী হবে।

মুতালাআ, কিতাবপাঠ ও মুরব্বির তত্ত্বাবধান

অনেক তালেবে ইলম এই বিরতিতে বেশি বেশি মুতালাআ করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। বিভিন্ন ফনের ওপর কিতাব পড়ার সংকল্প করেছেন। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আমাদের সব কার্যক্রম যেন মুরব্বিদের তত্ত্বাবধানে ও পরামর্শে হয়। নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত না নিয়ে, উস্তাদ ও মুরব্বিদের সঙ্গে পরামর্শ করে সামনে এগোনোই কল্যাণকর।

আমি নিজেও ইনশাআল্লাহ ধাপে ধাপে প্রত্যেকটি বিষয়ে আলাদা আলাদা শিরোনামে প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করব। কোন তাদরিবে কতটুকু যোগ্যতা দরকার, কতটুকু পড়া সম্ভব—সেগুলোও উল্লেখ করার চেষ্টা থাকবে।

শেষ কথা,,,,,,

সবচেয়ে বড় কথা হলো—এই দীর্ঘ বিরতি যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়ে যায়। এই সময় আমাদের জন্য পরীক্ষা—আমরা কি গাফলত করব, নাকি আত্মগঠনের পথে এগোব?

আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া— তিনি যেন আমাদের সময়ের সঠিক মূল্য বুঝার তৌফিক দান করেন, আমাদের আমলকে ইখলাসপূর্ণ করেন, মুরব্বিদের নসিহত অনুযায়ী চলার শক্তি দেন এবং ইলমের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হওয়ার তৌফিক দান করেন।

আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি