পর্ব ৭
পর্ব – ৭
নতুন ঠিকানা: বান্ধবীর ঘরে আশ্রয়
রাত তখন শেষ প্রহর। আকাশের বুকে ভোরের আলো একটু একটু করে ফুটে উঠছে, কিন্তু আরিয়ানার হৃদয়ের আকাশে তখনও গভীর অন্ধকার। সদ্য ঘর ছেড়ে আসা মেয়েটি হাঁটছে ঢাকার আঁধারের রাস্তায়—মাঝে মাঝে বাতাসে তার ওড়না নরমভাবে দুলছে, আর মাঝে মাঝে সেই বাতাসেই চোখের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে।
বাড়ির দরজা পর্যন্ত যে ভারী নীরবতা তাকে অনুসরণ করেছিল, সেটিই এখন পুরো পথে তার সঙ্গে যেন পাশাপাশি হাঁটছে। মেয়েটি জানে—এই রাত, এই পথ, এই সিদ্ধান্ত… সবই সহজ ছিল না। কিন্তু সে এটাও জানে, আল্লাহ তাআলা ছাড়া কেউ তার অন্তরের এই ঝড় বুঝবে না।
রাস্তায় মানুষের ভিড় তখনও তেমন নেই। কয়েকটি রিকশা, কিছু ছুটে যাওয়া মোটরসাইকেল, আর দূরে কোথাও ভোরের আজানের সুর। আরিয়ানা থামল। হাতে থাকা ব্যাগটা শক্ত করে ধরল। মসজিদের মিনার থেকে ভেসে এলো—
“الصلاة خير من النوم”
এই বাক্যটা যেন তাকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিল—
এই দুনিয়ায় ঘুম, আরাম, বিলাস—সবই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু আল্লাহর পথে যে ত্যাগ, সেটাই আসল আলো।
সে গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিল। তারপর আবার হাঁটা শুরু করল বান্ধবী লাবীবা’র বাড়ির দিকে।
লাবিবার দরজায় কড়া নাড়া
লাবিবা—শৈশবের বন্ধু, মনের মানুষ না হলেও হৃদয়ের আপনজন। দুনিয়া যখন তার সামনে দরজা বন্ধ করে দেয়, তখন এই লাবিবার ঘরই তার জন্য হয় আলোর জানালা।
আরিয়ানা যখন ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন আকাশে আলো পুরোপুরি ফুটে গিয়েছে। সে কড়া নাড়ল। ভেতর থেকে অবাক কণ্ঠ—
“কে… আরিয়ানা? এতো সকালে?”
দরজা খুলতেই লাবিবার মুখে একদিকে বিস্ময়, অন্যদিকে দুশ্চিন্তার ছাপ।
— “তুই! এই সময়ে? মুখ তো শুকিয়ে গেছে! কি হয়েছে?”
এই একটি প্রশ্নেই যেন আরিয়ানার সমস্ত জমে থাকা কান্না ফেটে বেরিয়ে এলো। সে কিছু বলতে পারল না—শুধু লাবিবার বুকে মাথা রেখে সন্তান হারা মায়ের মতো কাঁদতে লাগল।
লাবিবা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“কাঁদিস না, আগে ভেতরে আয়। আল্লাহ আছেন, সব ঠিক হবে—ইনশাআল্লাহ।”
এই একটা বাক্যই যেন আরিয়ানাকে আবার বাঁচিয়ে তুলল। কারণ তার ভিতরে একটা জিনিস পরিষ্কার—যে মানুষ আল্লাহর নাম নিয়ে কথা বলে, সে মানুষ কখনও তাকে বিপদে ফেলবে না।
নতুন ঘরের প্রথম সকাল
ঘরে ঢুকতেই আরিয়ানা অনুভব করল—এটা বড় বাড়ির মতো বিলাসী নয়, দামি ঝাড়বাতি নেই, সোনার আসবাব নেই। কিন্তু আল্লাহর কিতাব রাখার তাক আছে, নামাজের জানিমাজ বিছানো আছে, আর রয়েছে নিরাপত্তা, শান্তি, আর ভালোবাসার উষ্ণতা।
এটাই তার হৃদয়ের ঘর।
লাবিবা বলল—
“চল, আগে ওযু করে নামাজ পড়ে নিস। আল্লাহর কাছে মন হালকা হবে।”
আরিয়ানা মাথা নাড়ল। ওযু করে দাঁড়াল নামাজে। হাত তুলতেই চোখ দুটো বুজে গেল। তার হৃদয় কেঁদে উঠল—
“يا رب… دلّني إلى نورك، وإلى الطريق الذي يرضيك.”
— হে রব, আমাকে তোমার নূরের পথে ফিরিয়ে নাও।
সিজদায় সে নিজের ভিতরের সমস্ত যন্ত্রণাকে ঢেলে দিল। সে অনুভব করল— এই সিজদাহই তার প্রকৃত আশ্রয়, এই সিজদাহই তার জীবন, এই সিজদাহই তার সব।
লাবিবার বাড়িতে নিরাপত্তা
নামাজ শেষে লাবিবা তাকে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল—
“বাড়িতে কি হয়েছে তোর? কেমন করে বের হলি?”
আরিয়ানা সব বলল। বাবার সিদ্ধান্ত, পরিবারের চাপ, ধনী পাত্রের প্রস্তাব, তার না বলা, তার কান্না, দোয়া, ইস্তিখারা—সবকিছু।
সব শুনে লাবিবা গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর বলল—
“তুই ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিস। আল্লাহ কখনো তার বান্দাকে একা ছেড়ে দেন না।”
তারপর আবার বলল—
“এটাই তোর ঘর এখন। যতদিন ইচ্ছা থাকবি। তুই নিরাপদ আছিস, এটা শুধু আল্লাহর রহমত।”
আরিয়ানা ধীরে ধীরে হাসল। বহুদিন পরে তার হৃদয়ের মধ্যে অদ্ভুত শান্তি নেমে এল।
এই ছোট ঘরই এখন তার জান্নাতের ছায়া।
নতুন জীবনের সূচনা
এই নতুন ঠিকানায় আরিয়ানা শুধু নিরাপত্তাই পেল না—পেল এক নতুন সুযোগ।
সে নিজের ঈমানকে নতুন করে সাজাতে লাগল। মাঝে মাঝে সে নিজের ডাইরিতে লিখত—
“দুনিয়ার পথ যত কঠিনই হোক, আল্লাহর দিকে যাওয়া পথ সবসময় আলোয় ভরা।”
লাবিবার বাড়িতে সে এক নতুন জীবন শুরু করল— যে জীবনে রাতগুলো আর অশান্ত নয়, সকালের আলো আর ব্যথা নয়, বরং প্রত্যেক শ্বাসেই নতুন তওয়াক্কুল।
লাবিবা মাঝে মাঝে মজা করে বলত—
“তোর জীবনটা যেন উপন্যাস! দুনিয়ার রঙ ছেড়ে আল্লাহর পথে চলে গেলি!”
আরিয়ানা তার বক্তব্যে স্নিগ্ধভাবে বলত—
“আল্লাহ যখন পথ দেখান, তখন দুনিয়া রঙিন থাকলেও চোখের সামনে ম্লান লাগে।”
রোমাঞ্চের ইঙ্গিত: নতুন দিগন্তের ডাক
দিন কেটে যায়। আরিয়ানা ধীরে ধীরে ঘরোয়া জীবনে ফিরে আসে। কিন্তু তার ভেতরে একটা আগুন জ্বলতে থাকে— জ্ঞান অর্জনের আগুন, ইবাদতের আগুন, আল্লাহর নূরের দিকে দৌড়ে যাওয়ার আগুন।
এক রাতে লাবিবা ঘরে ঢুকে দেখল—আরিয়ানা বইয়ের স্তুপ নিয়ে বসে আছে। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, অংক, ইংরেজি, আইসিটি—সব বই।
লাবিবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—
“এতোগুলো বই? কি করতে যাচ্ছিস?”
আরিয়ানা চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে ছিল দুনিয়াকে বদলে দেওয়ার আগুন।
“জানিস লাবিবা… মানুষ আমাকে দুনিয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। আমি গ্রহণ করিনি। এখন আমি এমন কিছু করতে চাই—যাতে তারা বুঝবে, আল্লাহর পথে চলা মেয়েদের শক্তিকে কেউ থামাতে পারে না।”
লাবিবা চুপ। আরিয়ানা বইগুলো স্পর্শ করল যেন এগুলোই তার ভবিষ্যৎ।
তার চোখে তখন আলো— আগামী অধ্যায়ের আলো। নতুন যাত্রার আলো। জ্ঞান জগতের আলো।
📌 পরবর্তী পর্বের দিকে ইঙ্গিত
অষ্টম পর্বে আরিয়ানা প্রবেশ করবে সেই জগতে, যেখানে জ্ঞান হবে তার অস্ত্র, আর গবেষণা হবে তার পথ। যে মেয়েকে বিলাসী প্রাসাদে আটকে রাখা হয়েছিল— সেই মেয়েই হয়ে উঠবে জ্ঞানের রানি।
Comments
Post a Comment