পর্ব 8

 পর্ব 4

রাতে জানালার পাশে বসে থাকা আরিয়ানার চোখে তখনো ঘুম নেমে আসেনি। দিনের ক্লান্তি, রাতের নীরবতা—সব মিলিয়ে তার মনটা যেন আরও প্রশান্ত হয়ে উঠছিল। বান্ধবীর ঘরে নতুন জীবনের প্রথম রাত। পর্দার আড়ালে চাঁদের আলো পড়ছে তার গালে, আর সে চুপচাপ মনে মনে শুকরিয়া আদায় করছে—আল্লাহ তাকে হালাল আশ্রয় দিয়েছেন, নিরাপদ ঘর দিয়েছেন, দুনিয়ার ঝড়ো পরিস্থিতির মধ্যেও শান্তির ছোট একটি কোণ দিয়েছেন।

রিমি তখনও রান্নাঘরে ব্যস্ত। “আরিয়ানা, তুমি একটু বসো, আমি চা করে আনছি,”—এমন কোমল কণ্ঠে বলা কথাগুলো যেন তার ভেঙে যাওয়া হৃদয়ে একটু উষ্ণতা ঢেলে দিচ্ছিল। মানুষের ঘর, কিন্তু নিজের ঘরের মতোই শান্তি। নতুন জীবনের গতি মেনে নেওয়া, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা—সবকিছুই যেন তাকে আরও শক্ত করে তুলছিল।

কিন্তু এই নতুন জীবনের আসল সৌন্দর্য শুরু হয় পরদিন সকাল থেকে। রিমির ঘরটি ছোট হলেও বই-খাতায় ভর্তি। যেন ছোট্ট একটি লাইব্রেরি। দেয়ালে ঝোলানো কয়েকটা পোস্টার—Newton’s Laws, Periodic Table, Human Anatomy, Coordinate Geometry—সবই যেন আরিয়ানার হৃদয়কে এক আশ্চর্য শান্তিতে ভরিয়ে তুলছিল। সে যেন নিজের রাজ্যে ফিরে এসেছে—জ্ঞান, গবেষণা, বিজ্ঞান… এগুলোই তো তার প্রকৃত দুনিয়া।

ভোরবেলা ফজরের নামাজ শেষ করে কুরআন তিলাওয়াত করার পরে সে রিমির টেবিলে বসে গেল। সামনে খোলা ফিজিক্সের বই। “Motion, Force, Work, Energy, Power…”—তার চোখে আল্লাহর সৃষ্টির নিখুঁত ব্যবস্থা ফুটে উঠছিল। কোন সমীকরণই তার কাছে শুধু সমীকরণ ছিল না—বরং ছিল আল্লাহর কুদরতের প্রতিটি নিখুঁত পরিকল্পনার চিহ্ন।

যেমন, সে যখন নিউটনের প্রথম সূত্র পড়ছিল—“An object will remain at rest or continue to move in a straight line unless acted upon by an external force.”—তখন তার মনে হচ্ছিল ঠিক এভাবেই তো মানুষের জীবন। যখন কেউ আল্লাহর পথে সঠিকভাবে চলছে, তখন দুনিয়ার বাহ্যিক চাপ, সমাজের জোর, পরিবারের বাধা—এসবই তাকে পথ থেকে বিচ্যুত করতে চায়। অথচ যে হৃদয় দৃঢ় ঈমান ধরে রাখে, সে কখনোই ভেঙে পড়ে না।

রিমি চা নিয়ে এসে বলল, “শুরু করে দিলে দেখছি!” আরিয়ানা হেসে বলল, “হ্যাঁ, বিজ্ঞানই আমার শান্তি। রসুল ﷺ বলেছেন—‘হিকমত হচ্ছে মুমিনের হারানো সম্পদ।’ বিজ্ঞান তো আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করা, তাই না?”

রিমি মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ, কিন্তু তুমি তো বিজ্ঞান শুধু পড়ো না… তুমি অনুভব করো।” আরিয়ানা মৃদু হেসে বলল, “অনুভব না করলে বিজ্ঞান কখনো হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে না।”

তারপর সে কেমিস্ট্রির খাতা খুলল। Chemical Bonding—Electron transfer, Covalent bond, Ionic bond… সে মনে মনে ভাবছিল, মানুষের সম্পর্কও ঠিক এমন—কখনো সহজ, কখনো জটিল, কখনো দুর্বল, কখনো শক্ত। কিন্তু যেই বন্ধন আল্লাহর জন্য হয়, সেটা সবচেয়ে শক্ত, সবচেয়ে স্থায়ী। সে নিজের খাতায় একটি লাইন লিখে রাখল—“The strongest bond is the bond between a servant and his Creator.”

এরপর বায়োলজি। মানব দেহের প্রতিটি কোষ, প্রতিটি টিস্যু, প্রতিটি অঙ্গ—সবই আল্লাহর কুদরতের বিস্ময়। আরিয়ানা গভীর মনোযোগে Human Nervous System পড়ার সময় হঠাৎ চুপচাপ বলে উঠল—“মানুষের শরীরের প্রতিটি বৈদ্যুতিক সিগন্যাল, প্রতিটি নাড়ীর স্পন্দন, প্রতিটি শ্বাস… সবই আল্লাহর আদেশে।” রিমি অবাক হয়ে তাকাল। “তুমি পড়াশোনাকে উপাসনা বানিয়ে ফেলেছ।” “জ্ঞান যদি আল্লাহর পথে হয়, সেটাই তো ইবাদত।”

অংকের খাতা খুলতেই তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। গণিত তার কাছে শুধু সংখ্যা নয়—বরং যুক্তি, শৃঙ্খলা, আল্লাহর সৃষ্টির ভেতরকার নিখুঁত সামঞ্জস্য। Trigonometry পড়ে সে বলল, “আল্লাহ আকাশ-পৃথিবীকে এমন মাপে তৈরি করেছেন যার পরিমাপ মানুষের কাছে আজও বিস্ময়।” রিমি মুগ্ধ হয়ে বলল, “তুমি সত্যিই অদ্ভুত মেয়ে।” আরিয়ানা শান্ত হাসল, “অদ্ভুত না রে… শুধু দুনিয়ার গোলমালে হারিয়ে না গিয়ে নিজের ভেতরের আলোটা ধরে রাখার চেষ্টা করি।”

এক সময় ইংরেজির বই হাতে নিল। Prose, poetry, literature, narration, transformation… তাকে দেখে মনে হচ্ছিল—জ্ঞানই তার রাজত্ব। যেখানেই বসুক, যেই বিষয়ই সামনে আসুক, সে যেন জ্ঞানকে নিজের হৃদয়ে বন্দি করে ফেলতে পারে সহজেই। আইসিটি পড়ার সময় তো মনে হচ্ছিল সে যেন এক নতুন দুনিয়ায় ডুবে যাচ্ছে—প্রোগ্রামিং লজিক, অ্যালগরিদম, নেটওয়ার্ক সিকিউরিটি… সবই তার কাছে এতটাই সহজ, যেন বহুদিন ধরেই সে এসব জানত।

দিন গড়াতে লাগল। রিমির বাড়িতে থাকা, পর্দা রক্ষা, ইবাদত করা, নামাজ, পড়াশোনা, গবেষণা—সব মিলিয়ে তার জীবনের এক নতুন অধ্যায় যেন শুরু হয়ে গেল। সে রাতে ডায়েরি খুলে লিখল— “আল্লাহর পথে চললে দুনিয়া ছোট লাগে। জ্ঞানই আমার নিঃশ্বাস। আর ইবাদত আমার শক্তি।”

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—তার জ্ঞানের আলো শুধু তার ভেতরেই থেমে থাকেনি। দুনিয়া সেটা একসময় লক্ষ্য করল। ফিজিক্সে তার দক্ষতা, কেমিস্ট্রিতে তার বিশ্লেষণ, বায়োলজিতে তার গবেষণামূলক নোট; আইসিটি-তে তার লজিক্যাল চিন্তা—সব মিলিয়ে কেউ যেন ধীরে ধীরে তাকে চিনতে শুরু করল। রিমির কলেজের কয়েকজন শিক্ষক তার সমস্যা সমাধানের খাতা দেখে অবাক হয়ে গেলেন। “এই মেয়েটা কে? এত প্রতিভা কোথায় লুকিয়ে ছিল?” কিন্তু আরিয়ানা শুধু মাথা নিচু করে হাসল— “সবই আল্লাহর দান।”

তার পারদর্শিতা প্রকাশ পেতেই দুনিয়া তাকে ডাকতে শুরু করল— কোচিং সেন্টারের অফার, ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রাম, মডেলিং কোম্পানি, স্কলারশিপের প্রতিশ্রুতি… কিন্তু সে প্রচণ্ড শান্ত, কঠোর, দৃঢ়। দুনিয়া তাকে যতই টানুক, সে বলত— “আমি দুনিয়ার দিকে না, আখিরাতের দিকে দৌড়াই।”

এই নতুন জ্ঞানের জগতে ডুবে থাকা দিনগুলো তাকে আরও শক্ত করে তুলছিল। কিন্তু… দুনিয়ার অন্য আরেকটা ঝড় এগিয়ে আসছিল—যার ইঙ্গিত সে তখনও টের পাচ্ছিল না। তার পারদর্শিতা, তার আলো, তার সৌন্দর্য… সবই যেন কিছু মানুষের নজরে পড়তে শুরু করল, এবং শীঘ্রই সে এমন কিছু অফারের মুখোমুখি হবে—যেগুলো তার ঈমান, তার দৃঢ়তা, তার নৈতিকতা—সবকিছু পরীক্ষা করবে।

এভাবেই তার জ্ঞান আর ইবাদতের সমন্বয়ে নতুন জীবন চলতে থাকল… কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছিল দুনিয়ার সেই কঠিন অফারগুলো, যেগুলো অস্বীকার করলে মানুষ হাসে, আর গ্রহণ করলে মানুষ ধ্বংস হয়ে যায়। আরিয়ানা কি পারবেন সেসব অস্বীকার করতে? নাকি দুনিয়ার ঝলমলে আলো তাকে টেনে নিয়ে যাবে?

রিমির ঘরে কাটানো সেই প্রথম কয়েকটা দিনের মতো শান্ত সময় আরিয়ানা আগে কখনো খুব একটা পায়নি। বাড়ির অভিজাত বদ্ধ পরিবেশ, সোনালি দেওয়ালের চাপ, বিলাসী আসবাবের আড়ম্বর—সবকিছু থেকে দূরে এসে এখন তার জীবনে যে প্রশান্তি, তাকে মনে হচ্ছিল যেন হৃদয়ের ওপর থেকে বিশাল একটা পাথর নেমে গেছে।

দিনভর পড়াশোনা, মাঝে লেকচার ভিডিও দেখা, নোট তৈরি করা, সন্ধ্যায় রিমির সাথে ছোট্ট করে হাঁটতে বের হওয়া—এই সবমিলিয়ে তার জীবনে এমন এক ছন্দ তৈরি হচ্ছিল যা তার ভিতরকার আলোর সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই। আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানের প্রতি তার ভালোবাসা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না; সে প্রতিটি বিষয়কে এমন গভীরভাবে অনুভব করত যেন আল্লাহর কুদরতের রহস্যময় দরজা তার জন্যই খুলে রাখা হয়েছে।

প্রতিদিন সকালে ফজরের নামাজ শেষ করে কুরআন তিলাওয়াতের পর যখন সে বইয়ের টেবিলটাতে বসতো, তখন রিমি প্রায়ই দাঁড়িয়ে থেকে বলত,
“তুই যেভাবে পড়িস, মনে হয় যেন তুই আল্লাহর নূর ধরতে চাইছিস… বইয়ের পাতায় পাতায়।”
আরিয়ানা মৃদু হেসে জবাব দিত, “জ্ঞান তো আল্লাহরই দান, রিমি। এই দানকে কেউ যদি নিজের অহংকার বানায়, তবে সে বরকত হারায়। আর যদি ইবাদত বানায়, তাহলে সেই জ্ঞান তাকে আসমানের দিকে ওঠার সিঁড়ি দেয়।”

হঠাৎ রিমি একদিন তার কাছে এসে একটি কথা বলল—যা অদ্ভুতভাবে আরিয়ানার জীবনে নতুন মোড় আনল। রিমি বলেছিল, “দেখ, আজ আমাদের কলেজে একটি বিজ্ঞান কর্মশালা হচ্ছে। শিক্ষকরা তোকে যেতে বলেছেন। তোকে না দেখলে তারা যেন মানতেই পারছেন না তোরা এমন প্রশ্ন কীভাবে সমাধান করলি!”

আরিয়ানা একটু থমকে গেল। “কর্মশালায়? কিন্তু আমি… এখন তো প্রকাশ্যে কোথাও যেতে চাই না।”
“এটা প্রকাশ্য কিছু না। তুই অতিথি নাস, তুই গবেষণা আলোচনা করবি। তোর মতো মেধাবী মেয়ের ভাবনাগুলো তারা শুনতে চায়।”

রিমি আরো বলল, “তুই জানিস? গতবার যে কঠিন ফিজিক্স প্রবলেমটা তুই সমাধান করলি, সেই সমাধান দেখে আমাদের কলেজের দুইজন স্যার নিজেদের থিসিসে তোকে রেফার করতে চেয়েছেন!”

এই কথা শুনে আরিয়ানা অবাকই হয়ে গেল। “আমার নাম কোথাও থাকবে? আমি তো চাই না আমার জীবন আলোচনায় আসুক…”
রিমি তার কাঁধে হাত রেখে বলল, “শোন, আল্লাহ তোমাকে যে মেধা দিয়েছেন সেটা লুকিয়ে রাখা শোকর নয়। তবে হ্যাঁ, অহংকার করা গুনাহ। কিন্তু তুমি তো অহংকার করছ না, বরং সবসময় বলো—‘সকল প্রশংসা আল্লাহর।’ তাহলে ভয় কেন?”

এই কথাগুলো আরিয়ানার মনে এক ভিন্ন আলো জ্বেলে দিল। সত্যিই তো… জ্ঞান শোকর করলে বাড়ে, অহংকার করলে কমে। তাই সে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

কর্মশালার দিন— আরিয়ানা মুখে নিকাব, পুরোপুরি পর্দায়। কেউ তার পরিচয় জানল না, কেউ তার চেহারা দেখল না। কিন্তু তার জ্ঞানের আলো… সেটা কেউ আটকাতে পারল না।

বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান শিক্ষক তার হাতে একটি ফাইল দিয়ে বললেন, “এই সমস্যাটা আমরা দুইদিন ধরে সমাধান করতে পারছি না। তুমি কি দেখবে?”

সমস্যাটা দেখে আরিয়ানা মৃদু হাসল। “স্যার, এটা তো Vector Integration। এখানে ভুল হয়েছে coordinate transformation-এ।” স্যারের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। “তুমি… তুমি নিশ্চিত?”
“জি স্যার। এখানে দেখুন…” সে দ্রুত বোর্ডে সমাধান করে দেখাল।

পুরো হলরুম মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। সদ্য কলেজ শেষ করা একটি মেয়ে কীভাবে এমন সমাধান করতে পারে? সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলেও সে মাথা নিচু করে বলল, “আমার নয় স্যার, আল্লাহর সাহায্য।”

একজন শিক্ষক বলল, “তুমি কি আমাদের সাথে স্থায়ীভাবে কাজ করতে পারবে? আমরা তোমার জন্য বিশেষ গবেষণার ব্যবস্থা করব।”

আরেকজন বলল, “আমরা তোমাকে বিজ্ঞান বিভাগের অ্যাম্বাসেডর করতে চাই। তোমার কাজ দেখলে সবাই অনুপ্রাণিত হবে।”

অন্যদিকে রিমির ফোনে বারবার মেসেজ আসতে লাগল— “এই মেয়েটা কে?” “অসাধারণ স্কিল!” “আমরা তাকে স্কলারশিপ দিতে চাই।” “তার সাথে দেখা করতেই হবে।”

কিন্তু আরিয়ানা শুধু মাথা নিচু করে বলল— “আমি দুঃখিত। আমি কোনো প্রচারের পথে যেতে চাই না।”
শিক্ষকরা অবাক। “কেন?”

আরিয়ানা গভীর শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল— “মেয়েদের সম্মান পর্দায়। আর আমার লক্ষ্য আখিরাত। দুনিয়ার নাম বা ফেমের প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ নেই।”

শিক্ষকরা হতবাক। এরকম আত্মত্যাগ তারা আগে খুব কম দেখেছেন।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়… কয়েকদিনের মধ্যে আরেক ঝড় এল।

একদিন রাতে রিমি দৌড়ে এসে বলল, “তুই না আসলে বিশ্বাস করতাম না! তোর নোট দেখে ‘X-Tech Lab’ তোর সাথে কাজ করতে চায়!”

X-Tech Lab — দেশের বিখ্যাত একটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। ওরা সরাসরি মেসেজ পাঠিয়েছে— “We want to offer her a paid junior researcher position. Salary: 95,000 BDT/month + foreign internship.”

রিমি চিৎকার করে উঠল, “আরিয়ানা! তুই বুঝলি? এটা কি মজা নাকি? মানুষ এ অফারের পেছনে কয়েক বছর দৌড়ায়!”

আরিয়ানা ততক্ষণে সিজদায় বসে দ্বিতীয় রাকাত শেষ করছিল। দোয়া শেষ করে সে শান্ত গলায় বলল— “রিমি, আল্লাহ যদি চান তো আমাকে সমুদ্রও দেবে। কিন্তু যদি আমার ঈমান হারিয়ে যায়—তাহলে ওই বেতন দিয়ে আমি কী করব?”

রিমি হতাশ হয়ে বলল, “তুই কি সব সুযোগ ফিরিয়ে দেবে?”
আরিয়ানা চোখে অশ্রু নিয়ে বলল, “যে সুযোগ আমার অন্তর অন্ধ করে দেবে, তা গ্রহণ করা আত্মহত্যা। আমি দুনিয়ার চাকরি নেবো না। আমার লক্ষ্য আখিরাতের চাকরি।”

রিমি আর কথা বলতে পারল না। সে বুঝল— এই মেয়ের হৃদয় আল্লাহর প্রেমে এতটাই ভরা যে দুনিয়ার পুরো সোনা তার পায়ের কাছে রাখলেও সে মাথা নিচু করবে না।

এইভাবে দিনগুলো চলতে লাগল। জ্ঞান, ইবাদত, পর্দা, দোয়া, গবেষণা—সব মিলিয়ে তার জীবনের ভিত আরও শক্ত হল। কিন্তু দুনিয়া তো দুনিয়া… যতই অস্বীকার কর, আবার ফিরে এসে দরজায় ধাক্কা দেয়ই।

আরিয়ানার প্রতিভা আলো ছড়াতে শুরু করলে এবার আরেকটি জায়গা তাকে লক্ষ্য করল— মিডিয়া।

একটি বড় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বার্তা পাঠাল— “We want to take an interview of this extraordinary veiled girl.”

আরেকটি বলল— “We want a full documentary on her life, her knowledge, her faith.”

কেউ কেউ লিখল— “If she joins motivational speaking, she will be the biggest female icon of the decade.”

কিন্তু আরিয়ানা কঠোর কণ্ঠে বলল— “আমি নাম চাই না। আমি আলো চাই না। আমি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই।”

যে মেয়ে দুনিয়ার বিশাল প্রাসাদ ছেড়ে মাত্র কয়েক কদম দূরের একটি ছোট ঘরে এসে আশ্রয় নিয়েছিল, সে-ই এখন দুনিয়ার কাছে অদম্য এক শক্তির প্রতীক হয়ে উঠছে।

কিন্তু দুনিয়ার ঝড়ের শেষ এখানেই নয়… আসছে আরও বড় পরীক্ষা, আরও বড় প্রলোভন… যা তাকে পরীক্ষা করবে তার ঈমানের গভীরতায়।

দুনিয়ার অফার, হারামের ঝলক—কিন্তু সে অটল পাহাড়

আরিয়ানা বান্ধবীর ছোট্ট ঘরে বসে বইয়ের পাতা ঘুরাচ্ছিল। কিন্তু তার মনে হঠাৎ এক অদ্ভুত তড়িৎ খেলছিল। বান্ধবী হুরাইরা পাশের সোফায় বসে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী ভাবছ, আরিয়ানা? তোর মন যেন অন্যত্র ভেসে যাচ্ছে।” আরিয়ানা ধীরে চোখ তুলল, মুখে এক নরম হাসি, তবে চোখে দৃঢ়তার দীপ্তি। “হুরাইরা, আমি জানি আল্লাহ যাকে পছন্দ করেন, তার পরীক্ষা কখনো শেষ হয় না। আজকের পরীক্ষা শুধু বই নয়, জীবনও।”

সেই মুহূর্তে মোবাইলের ঘণিষ্ঠ সুরে এক কল এল। পরিচিতি দেখে হুরাইরা চমকে উঠল। আরিয়ানা কলটি ধরে নিল, আর সেই ফোন—সেই এক কল—তার জীবনকে নতুন এক ঝড়ের দিকে ঠেলে দিল। এক ধনী কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ফোন করে বলল, “আমাদের বড় প্রজেক্টে তোমার মেধা খুব দরকার। তুমি চাইলে আমাদের ঢাকার অফিসে যুক্ত হতে পারো। বেতন? অনন্ত সম্ভাবনা।”

হুরাইরা অবাক হয়ে বলল, “আরিয়ানা! এত বড় সুযোগ!” আরিয়ানা শুধু শান্তভাবে বলল, “হুরাইরা, সুযোগ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রাস্তা ছাড়া কোনো পথ আমাকে সুখী করতে পারবে না।”

মিডিয়ার ফেম এবং দুনিয়ার চমক

পরদিনই এক মিডিয়া প্রতিনিধি এসে হুরাইরার বাড়িতে হাজির হল। তিনি বললেন, “আমরা শোনেছি আরিয়ানা অসাধারণ মেধাবী। আমাদের ম্যাগাজিনে একাধিক সাক্ষাৎকার ও ফিচার দিতে চাই।” হুরাইরা উত্তেজিত, কিন্তু আরিয়ানা মৃদু হেসে বলল, “আমি আল্লাহর দিশায় চলি, দুনিয়ার আলোতে নয়।”

তবে মধ্যাহ্নভোজের সময় ফোনে এক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অফার এল—যেখানে তাকে বড় ধরনের পদের প্রলোভন দেখানো হলো। হাই-সেলার, বিলাসবহুল চাকরি, বিপুল বেতন—সব কিছুই সেখানে ছিল। আরিয়ানা হাওয়া গড়িয়ে এক শব্দ বলল, “না।” হুরাইরা চমকে জিজ্ঞেস করল, “কেন?” তিনি বলল, “কারণ এটি আমার জন্য নয়, আল্লাহর জন্য। আমার নফস চুপ হবে না, যদি আমি এমন হারাম ও অহেতুক সুখের পথে হাঁটি।”

অর্থের প্রলোভন

একদিন ব্যাংকের কর্মকর্তারা এসে বলল, “আরিয়ানা, আমরা চাই তোমাকে আমাদের ব্যাংকের বিশেষ গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত করতে। বেতন হাজার হাজার ডলার।” আরিয়ানা শুধু মাথা নেড়ে বলল, “আমি টাকা চাই না। আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই। যে টাকা পাবে, তার দাম হারাম পথে থাকলে কোনো মানে রাখে না।”

এমন দৃঢ়তা হুরাইরার হৃদয়ে নতুন শ্রদ্ধা জন্ম দিল। তিনি বলল, “তুই সত্যিই আল্লাহর পছন্দের পথে হাঁটছ।” আরিয়ানা কেবল হেসে বলল, “আমার লক্ষ্য আখিরাত, দুনিয়া কখনোই আমার হোক না।”

দুনিয়ার অফার এবং হারামের ঝলক

একদিন এক সিনেমা প্রডিউসার ফোন করল—“তোমার মেধা এবং সৌন্দর্য আমাদের জন্য বিশেষ। আমরা চাই তুমি আমাদের ফিল্মের মুখ্য চরিত্রে অভিনয় কর। বিলাসবহুল জীবন, ভক্তদের স্তুতি—সব তোমার।” হুরাইরা বিস্মিত, আরিয়ানা শান্ত। সে বলল, “আমি আল্লাহর বান্দা। দুনিয়ার ঝলক আমাকে কখনো মোহিত করবে না।”

তার দৃঢ়তা দেখেই প্রডিউসার বিস্মিত। তিনি বলল, “বালিকার মতো শক্ত মন… সত্যিই বিরল।” আরিয়ানা কেবল মনে মনে দোয়া করল, “হে আল্লাহ, আমার অন্তর কখনো হারামের দিকে প্রলুব্ধ হবে না। আমাকে দুনিয়ার মোহ থেকে দূরে রাখ।”

ফ্রেম এবং সামাজিক প্রভাবের পরীক্ষা

আরিয়ানা জানত, তার চারপাশের মানুষ তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হবে। তাই সে প্রতিদিন নামাজের প্রতি যত্নশীল, কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া, এবং বইপত্রে মগ্ন থাকত। কিন্তু শহরের কিছু ধনী পরিবারের ছেলে-মেয়ে তাকে ফলো করত, তার প্রতি ঈর্ষা জন্মাত। তারা বলত, “এই মেয়েটা কি তার জীবনে সব কিছু সহজভাবে পেয়েছে?” আরিয়ানা শুধু হাসত, “যে আল্লাহর দিশায় চলে, তাকে কোনো ক্ষতি হয় না।”

এই মনের দৃঢ়তা তাকে অন্যদের চোখে আলোকিত করে তুলেছিল। সে সবসময় জানত, দুনিয়ার ফেম কেবল সাময়িক, আর আল্লাহর সন্তুষ্টি চিরস্থায়ী।

পরীক্ষার মুহূর্ত

তার হুরাইরার ঘরে বসা এক সময়ে এক ঝড়ের মতো অবস্থা তৈরি হলো। একদিকে চাকরি, একদিকে মিডিয়া ফেম, অন্যদিকে বড় আর্থিক প্রলোভন। কিন্তু আরিয়ানা শান্ত। সে বলল, “হে আমার রব, আমাকে শক্তি দাও। আমি দুনিয়ার লোভে ভ্রান্ত হব না। আমি শুধু তোর দিকে তাকাব।”

সেদিন রাতভর সে কুরআন পড়ল, দোয়া করল, ইস্তিগফার করল। তার চোখে ছিল অশ্রু, কিন্তু হৃদয়ে অটল বিশ্বাস। “হে আল্লাহ, আমি চাইনা দুনিয়ার কিছু। শুধু তোর ভালোবাসা চাই।”

পরবর্তী অধ্যায়ের ইঙ্গিত

আরিয়ানা জানত, এই প্রলোভন শুধু শুরু। আসল ঝড় এখনো আসেনি। যে দুনিয়ার সমস্ত অফার একসাথে তাকে আঘাত করবে—চাকরি, ফেম, অর্থ, মিডিয়ার ভিড়—সবই পরীক্ষা করবে তার ঈমানের গভীরতায়। তাই সে গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল, “হে আল্লাহ, আমি প্রস্তুত। যা আসুক, আমি তোমার পথেই থাকব।”

এই প্রস্তুতি তাকে ঠেলে দেবে নবম অধ্যায়ের দিকে, যেখানে সে আরও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবে, এবং আমরা দেখব—কীভাবে আরিয়ানা সেই ঝড়ের মধ্যে তার ঈমান অটল রাখে। নবম অধ্যায়: ‘দুনিয়ার চূড়ান্ত প্রলোভন, হারামের স্বপ্ন—কিন্তু সে অটল পাহাড়’।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি