উপন্যাস 5
হৃদয়ের কান্না: মেয়ের সিদ্ধান্তের রাত
রাতের নীরবতা যখন চারপাশে ছায়ার মতো ঘিরে আসে, তখন মানুষের অন্তরের সবচেয়ে গোপন কান্নাগুলোই বেশি শোনায়। আকাশে চাঁদ ছিল অর্ধেক, কিন্তু তার আলো যেন অদৃশ্য কোনো ভারে ম্লান হয়ে ছিল। এমনই এক রাত—অতল অন্ধকার, চাপা নিস্তব্ধতা, আর মোমবাতির আলোতে জেগে থাকা একটি হৃদয়—আরিয়ানার হৃদয়।
সেদিনের আগের কয়েকটি ঘন্টা ছিল ঝড়ের মতো। বাবা—মোশাররফ হোসেন—রাগে কাঁপা কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, “বাবা-মায়ের সম্মান, পরিবারের ভবিষ্যৎ—সবই তোমার কাঁধে, আরিয়ানা। তুমি রাজি না হলেও ভেবে দেখো, যে পাত্র এসেছে সে আমাদের অগাধ উপকার করবে।”
মা, রওশন আরা, চোখের কোণে অশ্রু নিয়ে শুধু বলেছিলেন, “মা, আমরা তোমার মঙ্গলই চাই।”
নিজের ছোট বোন আরিবা আর বড় ভাই কামরুল—দু’জনেই কোনো কথা বলতে পারেনি। তাদের নীরবতা যেন ঘরের দেয়ালেও প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও একটি সত্যকে মুছে ফেলা সম্ভব ছিল না। আরিয়ানা কাউকে ভালোবেসেছিল। নাম—জাহিদ। ধনীর ছেলে নয়, প্রভাবশালীও নয়, কিন্তু হৃদয়ে ছিল খাঁটি ভালোবাসা আর আল্লাহর প্রতি গভীর তাওয়াক্কুল।
এখন এই রাতটি—যেন তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মোড়। চারদিকে অন্ধকার, মাথার ওপর কাঁধে চাপা দায়িত্বের পাহাড়, আর হৃদয়ের ভেতরে ভালোবাসা ও পরিবারের প্রতি আনুগত্যের নির্মম সংঘর্ষ।
ইস্তিখারার প্রস্তুতি: সিদ্ধান্তের টানাপোড়েন
রাত তখন ২টা ছুঁইছুঁই। সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু আরিয়ানা জেগে আছে। হাত কাঁপছে, বুক ধুকপুক করছে, চোখে বারবার পানি এসে জমে উঠছে।
সে দাঁড়াল নিজের ছোট সাদামাটা জানালার সামনে। তার সামনে আকাশ; তার ওপারে আছে আল্লাহ—যার কাছে সে বরাবরের মতোই আশ্রয় চেয়েছে। আজ আবারও চাইতে এসেছে, তবে এ রাতের আহাজারি অন্যরকম।
সে ধীরে ধীরে ওযু করল। পানির স্পর্শে মনে হলো ভেতরের ভার যেন কিছুটা হালকা হলো। তারপর সে সাদা টেলিটা মাথায় দিল, নামাজের চাদর গায়ে জড়াল, আর শান্ত স্বরে শুরু করল দুই রাকাত ইস্তিখারা।
প্রথম রাকাতে কুরআনের আয়াত পড়তে পড়তে তার চোখে পানি থামছিল না। দ্বিতীয় রাকাত শেষ করে সে সিজদায় নেমে পড়ল—এমনভাবে যেন তার বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারো আকুতি সিজদার মাটিতে গলে পড়ছে।
সিজদায় সে বলছিল: “আল্লাহ… তুমিই জানো আমার অন্তরের সব কথা। তুমি জানো আমি জাহিদকে ভালোবাসি, জানো আমার পরিবারকে কষ্ট দিতে চাই না। তুমি আমাকে সেই পথ দেখাও, যা আমার জন্যে উত্তম। আমাকে তোমার পছন্দমতো সিদ্ধান্ত নেয়ার সাহস দাও।”
চোখের পানি থামছিল না। মনে হচ্ছিল প্রতিটি অশ্রুবিন্দু যেন নিজের সাথে নিয়ে যাচ্ছে তার ভেতরের অসহ্য চাপ, আর প্রতিটি দোয়া তাকে একটু একটু করে আল্লাহর কাছে টেনে নিচ্ছে।
দোয়ার দীর্ঘ রাত: কান্নায় ভিজে যাওয়া চাদর
নামাজের পর সে উঠে বসল বিছানার পাশে। চারদিকে নিস্তব্ধতা। মা-বাবার ঘরের দিক থেকে হালকা নাকডাকার শব্দ আসছিল, কিন্তু সেই শব্দও যেন আজ তাকে তীরের মতো বিদ্ধ করছিল।
তার মনে হচ্ছিল—সে কি তাদের অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে? নাকি নিজের জীবনের দায়িত্ব নিতে চায়?
এ দুটি প্রশ্নই তাকে যেন শ্বাস নিতে দিচ্ছিল না। সে চাদরটা মুখে চেপে ধরে আবার কাঁদতে শুরু করল। চোখের পানি চাদর ভিজিয়ে ফেলছিল।
এত কান্নার মধ্যেও সে আবার দোয়া করল— “আল্লাহ, তুমি জানো তোমার বান্দার জন্য কোনটা উত্তম। তুমি তো মা-বাবার সম্মান রক্ষা করতে পারো, আমার ভালোবাসাও রক্ষা করতে পারো। আমি দুনিয়ার কাউকে কষ্ট দিতে চাই না, নিজের জীবনটাও অপচয় করতে চাই না। আমাকে পথ দেখাও।”
দোয়ার একসময় সে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। মাথাটা বালিশে ঠেকাতেই মনে হলো তার বুক যেন ভেঙে যাচ্ছে। তবু সে ঘুমোতে পারছিল না।
ঘড়িতে তখন ৩:৪২ মিনিট। এমন রাতগুলোয় সময়ও যেন জমে থাকে, থেমে থাকে, মানুষের চারপাশে একটা দমবন্ধ করা কুয়াশার মতো ঘেরা থাকে।
মনে ভেসে উঠল জাহিদের শেষ কথা
এই গভীর রাতে হঠাৎ তার মন যেন স্মৃতির দরজা খুলে দিল। জাহিদের শেষ কথাগুলো আবার যেন কানে বাজতে লাগল: “আরিয়ানা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। তুমি যা-ই সিদ্ধান্ত নাও, আমি তা মেনে নেব। কিন্তু যদি আমার অংশ হওয়ার সুযোগ থাকে, আমি সারাজীবন তোমার হিফাযত করব ইনশাআল্লাহ।”
এই কথাগুলোই তার অন্তরকে আরও অশান্ত করে তুলল। যদি সে পরিবারের কথা মেনে নেয়, তাহলে? জাহিদ কি চিরতরে হারিয়ে যাবে? আর যদি সে সত্যের পথ ধরে, নিজের চাওয়া পথে হাঁটে, তাহলে? তার পরিবার কি তাকে ক্ষমা করবে?
এই দোটানাই তার বুকের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।
আল্লাহর ইশারা: শান্তির ছোঁয়া
কান্নায় ক্লান্ত, দোয়ায় ভেজা হৃদয় নিয়ে সে যখন কিছুক্ষণ শুয়ে ছিল, তখন হঠাৎ খুব অদ্ভুত এক অনুভূতি তার মনকে ছুঁয়ে গেল। মনে হলো কেউ যেন ফিসফিস করে বলছে, “সত্যের পথে চল—আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।”
তার বুক হঠাৎই শান্ত হয়ে গেল। মনে হলো আল্লাহ যেন তাকে একটি সংকেত দিয়েছেন। তার মন বলছিল— সত্য, ঈমান আর পবিত্র ভালোবাসা—এই তিনটির ওপর দাঁড়িয়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আল্লাহ কখনো সেটিকে বরবাদ হতে দেন না।
কিন্তু সিদ্ধান্তটি খুবই কঠিন। এমন কঠিন যে তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল, ঠোঁট শুকিয়ে গেল, আর বুকের ভেতর ধুকপুক বাড়তে লাগল।
তবুও সে জানল— আজ রাতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সিদ্ধান্তের মুহূর্ত: নীরব চাঁদের সাক্ষ্য
আকাশে তখন ভোরের আগমনী আভা ফোটার আগপাছ। চাঁদ ছিল ঢলে পড়া অবস্থায়, যেন সেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে আরিয়ানার কান্না শুনতে শুনতে।
আরিয়ানা উঠে দাঁড়াল জানালার পাশে। মুখের অশ্রু মুছল। তার চোখে তীব্র দৃঢ়তা—মায়া, ভালোবাসা ও ঈমান মিলিয়ে তৈরি এক নতুন দৃঢ়তা।
সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কি? কেউ জানে না। কিন্তু আল্লাহ জানেন, আর সেই জ্ঞানের ওপরই সে নিজেকে সমর্পণ করল।
তারপর খুব শান্ত কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলল— “হে আল্লাহ, তুমি যা ঠিক জানো—আমি তাই করব।”
আজ রাতটি শেষ হলো সিদ্ধান্তের রাত হিসেবে— হৃদয়ের কান্না, দোয়া, তওয়াক্কুল আর ইস্তিখারার আলোয় ভেজা একটি রাত।
পরবর্তী পর্বের ইঙ্গিত
যে সিদ্ধান্ত সে নিল— সেই সিদ্ধান্তই তাকে নিয়ে যাবে এক অজানা পথে। এক অন্ধকার রাত, নিঃশব্দ পা ফেলে ফেলে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া, অনিশ্চয়তার পথে হাঁটা— কিন্তু যার প্রতিটি ধাপে ছিল আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল।
পরবর্তী পর্ব— ৬. বাড়ি ছাড়ার বিদায়: অন্ধকার রাস্তায় আলোর সন্ধান
Comments
Post a Comment