পর্ব 19
১৯. পর্দার আড়ালে রাজকন্যার রাজত্ব
হালাল নিকাহের পর আরিয়ানার জীবনে কোনো ঝলমলে প্রদীপ জ্বলেনি, কোনো উচ্চস্বরে উৎসব হয়নি, কিন্তু তার হৃদয়ের ভেতর জ্বলে উঠেছিল এক নিভৃত নূরের বাতি।
এই আলো ছিল না বাহ্যিক, এই আলো ছিল আত্মার।
সে বুঝে গিয়েছিল— আসল রাজত্ব কখনো মুকুটে হয় না, আসল রাজত্ব হয় চরিত্রে।
রায়হানের সংসরে প্রবেশ করে আরিয়ানা নিজেকে হারায়নি, বরং নিজেকে আরও গভীরভাবে খুঁজে পেয়েছে।
সে আর আগের মতো শুধু একাকী মেয়ে নয়, সে এখন এক নেক স্ত্রী, এক সচেতন মুসলিম নারী।
পর্দা— যা একসময় অনেকের চোখে ছিল সীমাবদ্ধতা, আরিয়ানার কাছে তা হয়ে উঠল সম্মানের মুকুট।
সে পর্দা করত ভয়ে নয়, সে পর্দা করত ভালোবাসায়।
কারণ সে জানত— যে আল্লাহর জন্য নিজেকে ঢাকে, আল্লাহ তার মর্যাদা আকাশে তুলে দেন।
বাইরে সে খুব সাধারণ।
কিন্তু সেই সাধারণতার ভেতর লুকিয়ে ছিল অদ্ভুত এক ব্যক্তিত্ব।
নরম কথা,
সংযত হাসি,
চোখে দৃষ্টি নত করার সৌন্দর্য।
মানুষ তাকে দেখে বলত—
“এই মেয়েটা বড় শান্ত।”
কেউ বুঝত না— এই শান্তির পেছনে কত যুদ্ধ জয় করা আছে।
আরিয়ানার দিন শুরু হতো ফজরের নামাজ দিয়ে।
সিজদায় মাথা রেখে সে বলত—
“হে আল্লাহ, আমাকে আপনার সন্তুষ্টির পথে রাখুন।”
ইবাদত তার জীবনের বোঝা ছিল না, ইবাদত ছিল তার বিশ্রাম।
যখন ক্লান্ত লাগত, সে কুরআন খুলত।
যখন মন ভারী হতো, সে দোয়ায় ভিজে যেত।
একদিকে সংসারের দায়িত্ব, অন্যদিকে জ্ঞানের সাধনা—
এই দুইয়ের মাঝে সে ভারসাম্য রক্ষা করেছিল আশ্চর্য দক্ষতায়।
রায়হান তাকে কখনো থামাননি।
বরং বলতেন—
“তোমার জ্ঞান তোমার ইবাদতেরই অংশ।”
আরিয়ানা পড়াশোনা চালিয়ে গেল।
বিজ্ঞান,
গবেষণা,
ইসলামি জ্ঞান—
সবকিছুকে সে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছিল।
সে প্রমাণ করল—
পর্দা মানে অজ্ঞতা নয়।
পর্দা মানে পিছিয়ে থাকা নয়।
পর্দা মানে আত্মসম্মানের সঙ্গে এগিয়ে চলা।
কেউ কেউ কটাক্ষ করত—
“এত পড়াশোনা করে কী হবে?”
আরিয়ানা মুচকি হাসত।
কারণ সে জানত— তার উদ্দেশ্য মানুষের প্রশংসা নয়।
তার রাজত্ব ছিল নিঃশব্দ।
কোনো মঞ্চে নয়,
কোনো ক্যামেরার সামনে নয়।
তার রাজত্ব ছিল—
একটি ঘরের ভেতর,
একটি হৃদয়ের ভেতর,
একটি আদর্শের ভেতর।
এই সংসরে সন্তান আসার আগেই সে সন্তানদের জন্য দোয়া করত।
“হে আল্লাহ, আমার ঘরটাকে দীনদার বানান।”
তার জীবনে সুখ এসেছিল,
কিন্তু সে সুখকে কখনো অহংকারে পরিণত হতে দেয়নি।
কারণ সে জানত— সবকিছুই আল্লাহর আমানত।
আরিয়ানা একদিন আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবল—
“আমি কি সেই রাজকন্যা, যাকে আমি একদিন হতে চেয়েছিলাম?”
উত্তর এল অন্তর থেকে—
“হ্যাঁ, কারণ তুমি আল্লাহর গোলামি বেছে নিয়েছ।”
এই রাজত্বের কোনো শেষ নেই।
এই রাজত্ব মৃত্যুতেও শেষ হবে না।
কারণ এই রাজত্বের ভিত্তি—
ঈমান।
আরিয়ানার গল্প এখানেই থেমে যায় না।
বরং এখানেই পাঠকের জন্য শুরু হয়—
নিজেকে প্রশ্ন করার অধ্যায়।
২০তম ও সর্বশেষ পর্বের ইঙ্গিত
এই উপন্যাস এখন দাঁড়িয়ে আছে শেষ দরজায়।
যেখানে গল্প ছাড়িয়ে জীবনের কথা বলা হবে।
যেখানে দুনিয়ার মোহ ছিঁড়ে আখিরাতের আলো দেখানো হবে।
সেখানে বলা হবে—
দুনিয়া বড় নয়,
ঈমান বড়।
সেই সমাপ্তির নাম—
“দুনিয়া ছাড়িয়ে আখিরাতের গল্প—উপন্যাসের মহৎ সমাপ্তি”
যেখানে পাঠক শুধু গল্প শেষ করবে না,
বরং নিজের জীবনের দিক নির্ধারণ করবে।
Comments
Post a Comment