পর্ব 17
১৭. পরিবারে ফিরে যাওয়ার অনন্য সিদ্ধান্ত
নূর যখন হৃদয়ে নামে, তখন মানুষ শুধু সামনে এগোয় না— সে পেছনেও তাকাতে শেখে।
আরিয়ানার হৃদয়ও ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছিল।
আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সেই নূরানি বার্তা তার জীবনকে যেমন বদলে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি তার মনে জাগিয়ে তুলেছিল এক পুরোনো ডাক—
বাড়ির ডাক।
অনেক রাত।
জানালার বাইরে শহরের আলো নিভে এসেছে।
কিন্তু আরিয়ানার চোখে ঘুম নেই।
তার সামনে ছড়িয়ে আছে স্মৃতির অ্যালবাম—
মায়ের হাতের রান্না,
বাবার গম্ভীর অথচ নিরাপদ কণ্ঠ,
শৈশবের উঠোন,
আর সেই ঘর—
যেখান থেকে সে বেরিয়ে এসেছিল একদিন নিঃশব্দ কান্না নিয়ে।
সে নিজেকে প্রশ্ন করল—
“আমি কি শুধু নিজের ঈমান বাঁচাতে গিয়ে সম্পর্কগুলোকে ফেলে এসেছি?”
“নাকি আল্লাহ আজ আমাকে বলছেন— ফিরে যাও?”
ফজরের আজানের ধ্বনি তার ভাবনায় ছেদ টানল।
সে উঠে অজু করল।
নামাজে দাঁড়িয়ে হঠাৎ তার চোখ বেয়ে অশ্রু নামল।
এই কান্না ছিল আলাদা।
এ কান্নায় ছিল—
ভয় নয়,
অভিমান নয়,
বরং দায়িত্ব।
সিজদায় সে ফিসফিস করে বলল—
“হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাকে সত্যিই নূর দিয়ে থাকেন, তবে সেই নূর দিয়ে আমার বাবা-মায়ের হৃদয়ও আলোকিত করুন।”
এই দোয়ার পর তার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ে গেল।
সে বুঝে গেল—
ফিরে যাওয়াই এখন তার ইবাদত।
বাড়ির পথে যাত্রার দিন তার বুক কাঁপছিল।
এবার সে পালাচ্ছিল না।
এবার সে যাচ্ছিল মাথা উঁচু করে।
ঈমান নিয়ে।
আদর্শ নিয়ে।
বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সে কয়েক মুহূর্ত থেমে গেল।
এই দরজার ওপারেই—
তার অতীতের সব ব্যথা,
সব ভুল বোঝাবুঝি,
সব চাপ।
কিন্তু সে জানত—
আজ সে একা নয়।
তার সাথে আছে আল্লাহ।
দরজায় কড়া নাড়তেই মা দরজা খুললেন।
এক মুহূর্ত—
দু’জনেই স্তব্ধ।
মায়ের চোখে বিস্ময়,
তারপর ধীরে ধীরে জমে উঠল জল।
আরিয়ানা কিছু বলার আগেই মা তাকে বুকে টেনে নিলেন।
কাঁপা কণ্ঠে শুধু বললেন—
“মা… তুই ভালো আছিস তো?”
এই এক বাক্যেই আরিয়ানার সমস্ত শক্ত বাঁধ ভেঙে গেল।
সে বুঝে গেল—
ভালোবাসা কখনো মরে না।
শুধু চাপা পড়ে যায়।
বাবা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
চোখে কঠোরতা,
কিন্তু সেই কঠোরতার ভেতর লুকিয়ে ছিল দীর্ঘদিনের ব্যথা।
আরিয়ানা ধীরে এগিয়ে গেল।
বাবার সামনে দাঁড়িয়ে চুপচাপ মাথা নিচু করল।
কোনো যুক্তি দিল না।
কোনো অভিযোগ করল না।
শুধু বলল—
“আব্বা, আমি ভুল করলে ক্ষমা চাই। কিন্তু আমি আল্লাহর পথে থাকতে চেয়েছি।”
ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
এই নীরবতা ছিল ভারী।
বাবা ধীরে ধীরে বললেন—
“আমরা তোকে হারানোর ভয়ে আল্লাহকেও ভুলে গিয়েছিলাম।”
তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
এই স্বীকারোক্তিই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল।
সেই দিন রাতে ঘরের বাতাস বদলে গিয়েছিল।
দীর্ঘ আলোচনা হলো।
এই আলোচনা ছিল—
ঝগড়ার নয়,
বুঝবার।
আরিয়ানা তার পথের কথা বলল।
কেন সে আপস করেনি।
কেন সে হারামকে না বলেছে।
কেন সে আল্লাহকে বেছে নিয়েছে।
এই কথা গুলোতে ছিল না বিদ্রোহ,
ছিল বিনয়।
ছিল আদব।
ছিল ইসলামি সৌন্দর্য।
মা নীরবে শুনলেন।
বাবা গভীরভাবে ভাবলেন।
শেষ পর্যন্ত বাবা বললেন—
“যে মেয়ে আল্লাহর জন্য এত ত্যাগ করতে পারে, সে কখনো ভুল পথে থাকতে পারে না।”
এই কথায় আরিয়ানা বুঝে গেল—
আল্লাহ সত্যিই হৃদয় গলান।
সেই রাতেই পরিবার একসাথে নামাজ পড়ল।
বহুদিন পর।
সেই সিজদায় অনেক পুরোনো অভিমান ধুয়ে গেল।
আরিয়ানা জানত—
এটা শেষ নয়।
এটা নতুন শুরু।
কারণ যখন পরিবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসে,
তখন আল্লাহও রহমত নিয়ে ফিরে আসেন।
১৮তম পর্বের ইঙ্গিত
এই শান্তির মাঝেই আসতে চলেছে আরেকটি দরজা—
ভালোবাসার দরজা।
কিন্তু এবার আর হারামের নয়।
এবার হালালের পথে।
যেখানে থাকবে—
নিকাহ,
দোয়া,
পবিত্র ভালোবাসা।
এক নেক যুবকের পক্ষ থেকে আসবে এমন একটি প্রস্তাব—
যেখানে সম্মান থাকবে আগে,
ভালোবাসা থাকবে আল্লাহর জন্য।
এই গল্প এগোবে পরবর্তী অধ্যায়ে—
“নেক যুবকের প্রস্তাব—হালাল পথে ভালোবাসার পূর্ণতা”
যেখানে ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে নিকাহর মাধ্যমে।
Comments
Post a Comment