10 পর্ব

 

১০. নেক মানুষের সাথে পরিচয়—লাভের প্রথম আলো

নবম অধ্যায়ের সেই ঝড় থেমে যাওয়ার পর, আরিয়ানার জীবনে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল। যেন দুনিয়া তার সমস্ত রঙ, সমস্ত প্রলোভন, সমস্ত শব্দ এক মুহূর্তের জন্য গুটিয়ে নিয়েছে। এই নীরবতাই ছিল নতুন কিছুর ভূমিকা—একটি আলো, যা ঝলমলে নয়; কিন্তু গভীর, প্রশান্ত ও দীর্ঘস্থায়ী।

আরিয়ানা তখনো হুরাইরার বাসায়। প্রতিদিনের মতো ফজরের পর কুরআন তিলাওয়াত, তারপর কিছু পড়াশোনা। দুনিয়ার অফারগুলো সে পেছনে ফেলে এসেছে, কিন্তু ভেতরের প্রশান্তি তাকে বিস্মিত করছিল। সে বুঝতে পারছিল—আল্লাহ যখন কিছু কেড়ে নেন, তখন তিনি তার বদলে আরও উত্তম কিছু দেন।

এক নীরব পরিচয়

সেই দিনটি ছিল সাধারণ। হুরাইরা জানাল, মসজিদের ইমাম সাহেবের মাধ্যমে একজন তরুণ কিছু বই পৌঁছে দিতে এসেছে। আরিয়ানা বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু দরজা খোলার মুহূর্তেই সময় যেন একটু থমকে গেল।

তরুণটির নাম ছিল ইয়াসির। সাধারণ পোশাক, কোনো আড়ম্বর নেই। কিন্তু তার চোখে ছিল এক ধরণের প্রশান্তি—যা আরিয়ানার চোখ বহুদিন পর চিনতে পারল।

ইয়াসির নিচু স্বরে সালাম দিল। তার দৃষ্টিতে কোনো কৌতূহলী চাহনি ছিল না, ছিল না কোনো অপ্রয়োজনীয় স্থিরতা। সে চোখ নামিয়েই কথা বলল— “এই বইগুলো আপনাদের জন্য পাঠানো হয়েছে।”

এই ভদ্রতা, এই সীমাবদ্ধতা—আরিয়ানার হৃদয়ে অদ্ভুত এক স্পর্শ রেখে গেল।

সম্মানের চোখ

হুরাইরা পরে বলল, — “লোকটা অন্য রকম না?” আরিয়ানা মৃদু হেসে উত্তর দিল, — “হ্যাঁ। ওর চোখে কোনো দাবি নেই, কোনো বিচার নেই। শুধু সম্মান।”

এই সম্মানই আরিয়ানাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। নবম অধ্যায়ে যেসব চোখ তাকে দেখেছিল—সেগুলো ছিল লোভী, আগ্রহী, প্রলুব্ধ। আর ইয়াসিরের চোখে ছিল একধরনের দূরত্ব—যা নিরাপদ।

সে বুঝতে পারছিল, ইসলামী চরিত্র কেবল দাড়ি বা পোশাক নয়— ইসলামী চরিত্র হলো চোখের ভাষা, নীরবতার ভদ্রতা, সীমারেখার সৌন্দর্য।

পরিচয়ের ধীরে ধীরে গভীরতা

পরবর্তী কয়েক দিনে ইয়াসিরের নাম বারবার আসতে লাগল। সে মসজিদভিত্তিক একটি শিক্ষামূলক কাজের সাথে যুক্ত। হুরাইরার পরিবারের কেউ কেউ সেই কাজে সহযোগিতা করে।

কথা হতো খুব সীমিতভাবে—প্রয়োজনের মধ্যে। কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়, কোনো অপ্রয়োজনীয় আলাপ নয়।

কিন্তু এই সীমিত কথোপকথনের মাঝেও আরিয়ানা লক্ষ্য করল— ইয়াসির যখন কথা বলে, তার বাক্যে থাকে আল্লাহর স্মরণ। কোনো সিদ্ধান্তের আগে সে বলে, “ইনশাআল্লাহ।” কোনো পরিকল্পনায় সে বলে, “আল্লাহ সহজ করুন।”

এই শব্দগুলো আরিয়ানার হৃদয়ে পরিচিত সুর তোলে।

প্রথম আলো

এটা কোনো সিনেমার প্রেম ছিল না। এটা ছিল না আকস্মিক আবেগ। বরং এক ধরণের স্বস্তি—যেমন দীর্ঘ ঝড়ের পর সকালের আলো।

আরিয়ানা নিজেকে প্রশ্ন করল— “আমি কি কিছু অনুভব করছি?” তার উত্তর নিজেই দিল— “আমি অনুভব করছি নিরাপত্তা।”

এই অনুভূতি তাকে ভয় দেখায়নি। কারণ এতে কোনো হারাম উত্তেজনা ছিল না। ছিল না সীমা ভাঙার ইচ্ছে।

বরং সে অনুভব করছিল— আল্লাহ যদি কাউকে পথে রাখেন, তবে সেই পথে হাঁটার সঙ্গীও তিনি দেন।

ইসলামী চরিত্রের প্রতিফলন

একদিন হুরাইরা জানাল, ইয়াসির নাকি বলেছে— “মেয়েদের সম্মান করা ঈমানের অংশ।”

এই একটি বাক্য আরিয়ানার চোখে জল এনে দিল। সে ভাবল— নবম অধ্যায়ে কতজন তাকে সুযোগ হিসেবে দেখেছে, আর এখানে একজন তাকে আমানত হিসেবে দেখছে।

ইয়াসির কখনো সরাসরি আরিয়ানার দিকে কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। কিন্তু তার আচরণ, তার দোয়া, তার কথাবার্তা—সবই ছিল পরিমিত, পবিত্র।

আরিয়ানা মনে মনে বলল— “হে আল্লাহ, যদি এটা তোমার পক্ষ থেকে হয়, তবে একে আমার জন্য কল্যাণকর করো।”

লাভের প্রথম আলো

এই পরিচয়কে ‘লাভ’ বলা যায় না দুনিয়ার অর্থে। এটা ছিল এমন এক লাভ—যেখানে মন শান্ত হয়, ঈমান ভরসা পায়।

আরিয়ানা বুঝতে পারছিল— আসল প্রেম চিৎকার করে আসে না, আসল ভালোবাসা সীমা ভাঙে না।

আসল ভালোবাসা আসে নীরবে— ইবাদতের পথে, দোয়ার মাঝে, তাকওয়ার ছায়ায়।

এক নতুন পথের আভাস

এই অধ্যায় এখানেই শেষ নয়। কারণ এই পরিচয় শুধু শুরু।

আরিয়ানা জানত— আগামী দিনগুলোতে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই সম্পর্ক কোন পথে যাবে— নফসের পথে, না ঈমানের পথে।

কিন্তু তার অন্তর একটাই কথা বলছিল— “হালাল ছাড়া কোনো সৌন্দর্য নেই।”

১১তম পর্বের দিকে ইঙ্গিত

এই প্রথম আলো তাকে প্রস্তুত করছিল এক নতুন যাত্রার জন্য। যেখানে দু’টি হৃদয় একসাথে হাঁটবে— কিন্তু হাত ধরে নয়, বরং আল্লাহর পথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।

সেই যাত্রার নাম— “হৃদয়ে ঈমানের পথে হাঁটা দু’জন”

পরবর্তী পর্বে দেখা যাবে— রোমান্টিকতা থাকবে, কিন্তু হালাল সীমারেখার ভিতর। থাকবে ইবাদত, উপদেশ, স্বপ্ন— যেখানে ভালোবাসা হবে আল্লাহর জন্য।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি