আনাস হোসাইন সাদিদ : ভ্রাতৃত্বের এক নিবিড় অনুভব

 

আনাস হোসাইন সাদিদ : ভ্রাতৃত্বের এক নিবিড় অনুভব

আনাস হোসাইন সাদিদ—এই নামটির প্রতিটি অক্ষরের মাঝে যেন ছড়িয়ে আছে বরকত, ভালোবাসা, এবং এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য। নামের মধ্যেই এক ধরণের আভিজাত্য ও মমতার মাধুর্য যেন মিশে আছে। আমি যখন প্রথম জানতে পারি এই নামটি এক মহান মানুষের সাথে সম্পর্কিত, তখন অন্তর যেন আনন্দে ভরে উঠেছিল।

সৌভাগ্যক্রমে আমি সাক্ষাৎ লাভ করি তার বড় ভাই আহসান নাহিরের সঙ্গে, যিনি নিজেও একজন মার্জিত, হৃদয়বান ও জ্ঞানী ব্যক্তি। তাদের দু'ভাইয়ের মধ্যকার সম্পর্ক, চরিত্র এবং মার্জিত ব্যবহারে আমার অন্তর আপ্লুত হয়ে ওঠে। আহসান নাহির ভাই যখন আমাদের গ্রামে সফরে আসেন, তখনই সুযোগ হয় এই শুভাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতার। মরিচা চৌধুরীপাড়া জামে মসজিদে তাঁর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়—এক পবিত্র স্থানে, পবিত্র মানুষের সাথে সাক্ষাত—এ যেন এক অপূর্ব মুহূর্ত।

শুধু তাই নয়, তিনি আমাদের মহল্লার জামে মসজিদেও এসেছিলেন। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে তখন আমি মাদ্রাসায় থাকার কারণে তার সাথে সরাসরি দেখা করতে পারিনি। হৃদয় ভারাক্রান্ত হলেও আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহে অবশেষে তিন মসজিদ অতিক্রম করার পর তাঁর সাথে আমার প্রতীক্ষিত সাক্ষাৎ ঘটে। এই মুহূর্তটি আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয়, অমূল্য স্মৃতি হয়ে রইল।

তখনই জানতে পারি তিনি সেই আনাস হোসাইন সাদিদেরই ভাই, যার নাম শুনলেই হৃদয়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ভেসে ওঠে। আমি যেন অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকি তাঁর দিকে। কল্পনাও করিনি কোনোদিন এমনভাবে তাঁর ভাইয়ের সাথে আমার দেখা হবে। মনে মনে বারবার ভাবি—এ কী মহান পরিকল্পনা আল্লাহ তাআলার! এক অজানা আবেগ ও গর্বে বুকটা ভরে যায়।

আমি তখন নিজেকে আর থামাতে পারিনি। আগ্রহের সাথে জানতে চেয়েছি আনাসের ব্যাপারে—তার পড়াশোনা, তার চরিত্র, তার দীনদারির নানা দিক নিয়ে আমরা অনেকক্ষণ আলোচনা করি। তাঁর ভাইও দয়াপূর্ণ হাসিতে আমাদের সব প্রশ্নের জবাব দেন, তিনি অত্যন্ত বিনয় ও আন্তরিকতায় আমাদের মুগ্ধ করেন। আল্লাহর শোকর আদায় করি—তিনি এমন মানুষদের মাধ্যমে আমাদেরকে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও সম্মান কীভাবে বিনিময় করতে হয়, তা শিখিয়ে দেন।

আনাস হোসাইন সাদিদ আর আমি এক মাদ্রাসায় পড়েছি, একই আঙিনায়, একই বাতাসে আমরা তালিম গ্রহণ করেছি। যদিও হয়তো ভিন্ন শ্রেণিতে ছিলাম, ভিন্ন সময়ে একে অপরের সাথে দেখা হয়েছে, কিন্তু এই সম্পর্ক, এই বন্ধন—এটা শুধুমাত্র দুনিয়াবী নয়; এটা আখিরাত পর্যন্ত বিস্তৃত সেই চিরস্থায়ী ভাইয়ত্বের সম্পর্ক।

স্মৃতির পাতায় যেন বারবার ভেসে ওঠে সেইসব দিন, যেদিন আমরা একই ছাদের নিচে কিতাবের পাতা উল্টেছি, একসাথে নামাজ পড়েছি, একে অপরকে সালাম দিয়ে দোয়া করেছি। এই মুহূর্তগুলো আমার হৃদয়ের গহীনে চিরস্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

আমি এখনো বিস্মিত হই—আল্লাহর কী অপার কুদরত! কতভাবে, কত পন্থায় তিনি তাঁর বান্দাদের মাঝে ভালোবাসার সুতো বুনে দেন। আমি ভাবতেই পারিনি, আনাসের মতো একজন প্রিয় মানুষকে কাছ থেকে জানার সুযোগ পেয়ে যাব তাঁর ভাইয়ের মাধ্যমে।

আহসান নাহির ভাইয়ের ব্যবহার, জ্ঞানের গভীরতা, এবং নম্রতা আমাকে অত্যন্ত মুগ্ধ করেছে। মনে হয়েছে, তিনি যেন আনাসেরই ছায়া। এ যেন এক আয়নায় দুই প্রতিবিম্ব। এই দুই ভাই যেন দুনিয়ার ভেতরে দীন ও আদর্শের এক দীপ্ত নিদর্শন।

আমি অন্তরের গভীর থেকে দোয়া করি—আল্লাহ যেন তাঁদের দুই ভাইকে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম পুরস্কারে ধন্য করেন। তাদের পরিবারে যেন বরকত বর্ষিত হয়। আমিও যেন তাঁদের মতোই নিষ্ঠাবান, আন্তরিক ও আল্লাহভীরু তালিবে ইলম হয়ে উঠতে পারি।

ভ্রাতৃত্ব শুধু রক্তের বন্ধন নয়, বরং বিশ্বাস, আদর্শ ও ভালোবাসার গভীর মেলবন্ধন। এই ঘটনা আমাকে শিখিয়েছে—আল্লাহ যাদের মাঝে সত্যিকার মহব্বত দান করেন, তারা দূরে থেকেও অদৃশ্য সুতোয় আবদ্ধ থাকে।

আমি আমার এই অনুভবকে হৃদয়ের গহীন থেকে শব্দের মালায় গেঁথে রাখলাম। যেন একদিন যখন অতীত হয়ে যাবে এই দিনগুলো, তখন এই লেখাগুলোই হবে স্মৃতির পাতায় এক উজ্জ্বল প্রজ্জ্বলন।

— মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা

আনাস : এক মেধাবী তরুণ তালিবে ইলম

সেই মাদ্রাসার নাম হলো মারকাজুল ইলমি ওয়াদ দাওয়াহ বাংলাদেশ। এক বরকতময় প্রতিষ্ঠান, যেখানে ইসলামের জ্ঞান ও হিকমাহ আলোকচ্ছটা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি দরসগাহে। আমি সেখানে পড়াশোনা করি এবং আলহামদুলিল্লাহ, এমন একটি পরিবেশে থাকার সুযোগ আমার জন্য এক অনন্য নেয়ামত।

একদিন, মাদ্রাসা ছুটি শেষে আমি ফিরে এলাম আমার প্রিয় মারকাযে। কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধুর সাথে কথা হলো হোয়াটসঅ্যাপে। সেই বন্ধু, যার নাম আনাস — যার কথা মনে পড়তেই হৃদয়ে এক প্রশান্তির ঢেউ বয়ে যায়। আনাস ছুটিতে তার বাড়িতে গেলেও, আমাদের বন্ধুত্বের সেতু এতটাই দৃঢ় যে দূরত্ব তা কমাতে পারেনি।

গত বছর আমি ছিলাম জালালাইন জামাতে, আর সে ছিল হেদায়াতুন্নাহু জামাতে। ভাগ্যের চমক এমন যে আমাদের রুম ছিল একটাই, শুধু মাঝখানে একটি পার্টিশন বিভাজন তৈরি করেছিল। সেই পার্টিশন শরীরের জন্য ছিল, হৃদয়ের নয়। আমাদের হৃদয়জুড়ে ছিল ভালোবাসা, সম্মান, ইলম ও আল্লাহর সন্তুষ্টির এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ ভ্রাতৃত্ব।

আনাস, আল্লাহ যাকে এক অনন্য গুণাবলি দিয়ে সাজিয়েছেন। সে একাধারে নম্র, ভদ্র, বিনয়ী, আর সৌজন্যবোধে পূর্ণ। কখনো কারো সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে জড়ায় না, কখনো কাউকে কষ্ট দিয়ে কথা বলে না। মুখে সদা সত্য কথা, আচরণে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের প্রতিচ্ছবি। আল্লাহ তার বক্ষে ইলমের নূর দান করেছেন। তার চোখে রয়েছে দীপ্ত এক লক্ষ্য, এবং অন্তরে রয়েছে দীনের প্রতি গভীর ভালোবাসা।

তার মেধা এত প্রখর যে অল্প সময়েই যে কোনো দরস সে আয়ত্ত করে ফেলে। প্রতিটি মাসআলা, প্রতিটি ইবারত সে গভীর মনোযোগ ও গভীর উপলব্ধি নিয়ে পাঠ করে। তার এই মেধা ও অধ্যবসায় ওস্তাদদের দৃষ্টি এড়ায়নি। ওস্তাদরা তাকে ভালোবাসেন, স্নেহ করেন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা দেন। সে যথার্থ ছাত্র, যারা ওস্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ পরিচালনা করে।

আনাস শুধু বইয়ের পাণ্ডিত্যে সীমাবদ্ধ নয়, সে একাধারে একজন হাফেজুল কুরআন এবং সুমধুর কণ্ঠের কারীবাংলাভিশনে ‘পুষ্টি কুরআনের আলো’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সে অভাবনীয় ফলাফল অর্জন করেছে। পুরো বাংলাদেশের দর্শক তার তেলাওয়াত শুনে বিমোহিত হয়েছে। আজও ইউটিউব খুললেই তার হৃদয়গ্রাহী তেলাওয়াত মানুষকে কাঁদিয়ে তোলে।

মারকাযে আমাদের মাঝে মজলিসুয যিকর অনুষ্ঠিত হতো নিয়মিত। সে সময় আনাসই প্রায়শ প্রথমে তিলাওয়াত করত। তার কণ্ঠে কুরআনের আয়াতগুলো এমনভাবে উচ্চারিত হতো যে, পুরো দরসগাহ এক অপার্থিব প্রশান্তিতে ডুবে যেত। মনে হতো, যেন কুরআনের সুরেলা শব্দগুলো আসমান থেকে ধ্বনিত হচ্ছে।

আনাসের অন্তর ছিল কোমল, যেমনটা মোম হয় আগুনে গলে — কিন্তু তার আক্বিদা ছিল দৃঢ়, ঈমান ছিল পাহাড়সম মজবুত। সে দুনিয়ার বাহ্যিক চাকচিক্যে মুগ্ধ হতো না, বরং তাকিয়ে থাকত আখিরাতের সোনালি সফলতার দিকে। তার প্রতিটি আমল, প্রতিটি চিন্তা ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদিত।

একজন তালিবে ইলম হিসেবে আনাস শুধু পড়ালেখায় নয়, চরিত্রেও ছিল অনন্য। তার ব্যবহার, কথা বলার ভঙ্গি, এবং বড়দের প্রতি সম্মান দেখে সবাই মুগ্ধ হতো। সে কখনো কারো গীবত করত না, অন্যের দোষ খুঁজত না, বরং দোষ ঢাকার চেষ্টা করত। তার বন্ধুদের প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা, এবং সে তাদের জন্য সবসময় দোয়া করত।

আনাসের মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। আমি কৃতজ্ঞ আল্লাহর কাছে, যিনি আমাকে এই মহান হৃদয়ের বন্ধু দিয়েছেন। আমাদের মাঝে বাহ্যিক রুম বিভাজন থাকলেও, হৃদয়ের বন্ধনে আমরা ছিলাম অবিচ্ছেদ্য। আজো সেই স্মৃতি হৃদয়ে গেঁথে আছে — একসাথে দরস পড়া, মজলিসে বসা, তেলাওয়াতে মগ্ন হওয়া, ওস্তাদের কাছে দিকনির্দেশনা নেওয়া — সব কিছুই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

আনাস এক প্রতিভা, এক দীপ্ত আলো, এক ইলমের সোনালি দীপ্তি। তার মতো ছাত্র শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং একটি জাতির গর্ব। আমরা তার জন্য দোয়া করি — আল্লাহ তাকে দীনের জন্য কবুল করে নিন, এবং তার ইলমের আলো যেন পৃথিবীর অন্ধকার প্রান্তেও পৌঁছায়।

আমার বন্ধু আনাস

সেই মাদ্রাসার নাম হলো মারকাযুল ইলমি ওয়াদ দাওয়াহ বাংলাদেশ। আনাস ছুটিতে বাসায় এসেছে আর আমার ছুটি শেষ হয়ে আমি মাদ্রাসায় পৌঁছে গিয়েছি। গতকাল ওর সাথে আমার কথা হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপে। আমি ভাবতেও পারিনি যে আনাসের সাথে আমার কথা হবে।

যাই হোক, গত বছর আমি জালালাইন জামাতে ছিলাম আর সে ছিল হেদায়াতুন্নাহু জামাতে। আমাদের রুম একটাই ছিল, শুধু মাঝখানে পার্টিশন ছিল। সে খুব ভদ্র স্বভাবের, অত্যন্ত নম্র এবং বিনয়ী ছেলে। কখনো কারো উপর কথা বলে না, কখনো কারো সাথে ঝগড়া করে না। সর্বদা সত্য কথা বলে এবং আল্লাহ তার ভিতর এক ইলমের নূর দান করেছেন।

অত্যন্ত মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান ছেলে। অল্প সময়ের মধ্যে অতি দ্রুত সে পড়া আয়ত্ত করে ফেলতে পারে। ওস্তাদদের সাথে তার সম্পর্ক অতুলনীয়। ওস্তাদরা তাকে অনেক ভালোবাসে এবং মহব্বত করে। তারা প্রতিটি সময়ে তাকে দিকনির্দেশনা দিয়ে তার জীবনকে ধন্য করে দেয়। আনাস ও ওস্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সব সময় চলে।

আনাস পুষ্টি কুরআনের আলো (বাংলাভিশন) অনুষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়েছে এবং খুবই সুন্দর ফলাফল করেছে। পুরো বাংলাদেশের মধ্যে আজও তার তেলাওয়াত ইউটিউবে পাওয়া যায়। অত্যন্ত মেধাবী ও যোগ্য ছেলে আনাস।

আমাদের মারকাযুল ইলমি ওয়াদ দাওয়াহ-তে যখন মজলিসুয জিকরা হতো, তখন আনাস প্রায়শই সবার সামনে তেলাওয়াত করতো।

এবং তার তিলাওয়াত শুনে সবার হৃদয়ে নাড়া খেত। সবাই আবেগে আপ্লুত হয়ে তার তিলাওয়াত শুনতো এবং অন্তরের মধ্যে ঈমান বৃদ্ধি পেতে থাকতো। আল্লাহ তাকে অনেক সুন্দর এবং আকর্ষণীয় তেলাওয়াতের কণ্ঠ দান করেছেন।

বহুমুখী যোগ্যতা তাকে দান করেছেন আল্লাহ তা‘আলা।

আমরা দোয়া করি, আল্লাহ তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সাহায্য এবং নুসরাত কায়েম রাখুন এবং তাকে পৃথিবীর বুকে একজন যোগ্য আলেম হিসেবে কবুল করুন। এবং তার দ্বারা ইলমের বহুমুখী খেদমত আঞ্জাম দেওয়ার তৌফিক দান করুন।

এবং তার হাতে লিখিত প্রত্যেকটা ফনেই যেন আল্লাহ কিতাব লেখার দান করেন। সে যত বেশি লিখে যাবে, উম্মাহ তত বেশি তার দ্বারা উপকার হাসিল করতে পারবে।

আল্লাহ আমার আনাস ভাইকে অত্যন্ত মেধা দান করেছেন। আল্লাহ তাকে কবুল করুন। তাকে অনেক বড় আলেমে দ্বীন হিসেবে কবুল করুন। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি