পরীক্ষা, ফলাফল ও আমাদের মনোভাব
পরীক্ষা, ফলাফল ও আমাদের মনোভাব
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা
প্রিয় সহপাঠী ও বন্ধুসম, আমরা সকলে জানি, গত কয়েক সপ্তাহ আগে আমাদের প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। অনেক মাদ্রাসার ফলাফল ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে, আর কিছু মাদ্রাসার ফলাফল হয়তো এখনো দেওয়া বাকি। পরীক্ষার দিনগুলোতে আমরা যে মেহনত করেছি, সেই মেহনতের প্রতিফলনই ফলাফলের কাগজে ফুটে উঠবে। তবে আমি আজ তোমাদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—ফলাফল যেমনই আসুক, সেটাকে গ্রহণ করতে হবে একজন প্রকৃত তালিবুল ইলমের মানসিকতা নিয়ে।
আমরা যখন পরীক্ষার হলে বসেছিলাম, তখন আমাদের প্রত্যেকের মনেই আশা ছিল—ইনশাআল্লাহ আমি ভালো লিখেছি, আমি ভালো ফলাফল করব। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রেখো, আমাদের প্রতিটি লিখন, প্রতিটি নম্বর, এমনকি একটি অক্ষরের উপরেও তাকদীরের ফয়সালা বিদ্যমান। আমরা যে মেহনত করেছি সেটার কদর আল্লাহর কাছে অবশ্যই আছে। কিন্তু ফলাফল যদি আমার আশা অনুযায়ী না হয়, তবে তাতে মন খারাপ করার কিছু নেই। কারণ পরীক্ষা আসলে পরীক্ষা, আর ফলাফল কেবল তারই একটি অংশ।
ভাই ও বন্ধুরা, মনে রেখো—পরীক্ষা খারাপ হলে এর মানে এই নয় যে তুমি ব্যর্থ। বরং এটা তোমাকে নতুন করে উজ্জীবিত হওয়ার, আবারো মেহনত করার এবং নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দিচ্ছে। মন খারাপ করে বসে থাকলে কিছুই পরিবর্তন হবে না, বরং সময় নষ্ট হবে। আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, তাঁর তাকদীরে বিশ্বাস রাখা এবং আগামীর জন্য নতুন উদ্যমে শুরু করা—এই তিনটি বিষয় ছাত্রজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আমি তোমাদের কাছে অনুরোধ করছি—যখন ফলাফল হাতে পাবে, তখন সেটা হাতে নিয়ে বসে কেঁদো না, হতাশ হয়ো না, বই বন্ধ করে রেখো না। বরং একবার চিন্তা করো, আমার কোথায় ভুল হয়েছে? কোন বিষয়ে দুর্বলতা আছে? কেন আমার কাঙ্ক্ষিত নম্বর এলো না? এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর খুঁজে বের করতে পারলেই তোমার আসল সাফল্যের পথ খুলে যাবে।
একজন প্রকৃত তালিবুল ইলম কখনোই সামান্য একটি খারাপ ফলাফলের জন্য নিজের আশা ভেঙে দেয় না। বরং সে ভাবে—“এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার জন্য একটি বার্তা, হয়তো আমি যথেষ্ট মনোযোগ দেইনি, এবার আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।” তাই, হে প্রিয় সহপাঠী, আমরা যেন পরীক্ষার ফলাফলে ব্যর্থতার ছায়া না খুঁজি, বরং সফলতার নতুন আলোকরেখা দেখি।
আমি জানি, অনেক সময় মনে কষ্ট হয়। বিশেষ করে যখন দেখি আমার বন্ধুরা ভালো নম্বর পেয়েছে আর আমি পারিনি। কিন্তু ভাই, কখনো ভুলো না—তোমার লেখা যদি দুর্বলও হয়, তোমার চোখের অশ্রু, তোমার মেহনত, তোমার রাতের জাগরণ—সবকিছুই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। তাই মন খারাপ করার কোনো কারণ নেই। আল্লাহ আমাদের সবার জন্য আরও ভালো কিছু রেখেছেন, আমাদের শুধু মেহনত চালিয়ে যেতে হবে।
এই পৃথিবীর প্রতিটি সফল মানুষ ব্যর্থতার ভেতর দিয়েই এগিয়েছে। যারা প্রথম ধাক্কায় হাল ছেড়ে দেয়, তারাই পিছিয়ে থাকে। আর যারা ব্যর্থতার ভেতর থেকেও দাঁড়িয়ে যায়, তারাই ইতিহাস রচনা করে। তাই, আমার ভাই, মনে রেখো—একটা খারাপ নম্বর কখনোই তোমার ভবিষ্যৎকে নির্ধারণ করে না। তোমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে তোমার ধৈর্য, তোমার চেষ্টা আর তোমার আল্লাহর উপর ভরসা।
পরীক্ষা ও আমাদের দায়িত্বপ্রিয় ছাত্রবন্ধুরা, গত কয়েক সপ্তাহ আগে আমাদের মাদরাসাগুলোতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। কারও ফলাফল হাতে এসেছে, কারওটা হয়তো আসেনি। ফলাফল পাওয়ার সময়ই ছাত্রের প্রকৃত যোগ্যতা ও মেহনতের পরিচয় ফুটে ওঠে। কিন্তু মনে রেখো, শুধু একটি ফলাফলই জীবনের সবকিছু নয়। ভালো ফল করলেও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে, আর ফলাফল যদি মনমতো না হয় তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
পরীক্ষায় সামান্য খারাপ করলে মন খারাপ করার কোন কারণ নেই। আল্লাহ্ তাআলা প্রতিটি বিষয়ে একটি ফায়সালা রেখেছেন। আমাদের কাজ হলো হিম্মত হারানো নয়, বরং সামনে এগিয়ে যাওয়া। কেঁদে কেটে সময় নষ্ট না করে, কিতাব বন্ধ না রেখে, বরং আরও নতুন উদ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে মেহনত করলে আগামী পরীক্ষা অবশ্যই ভালো হবে।
তাই, হে ছাত্ররা! মনে রেখো—সফলতা তাদের জন্য যারা ব্যর্থতার পরও দাঁড়িয়ে যায়, কান্না নয় বরং মেহনতকে আঁকড়ে ধরে রাখে। তোমাদের প্রতিটি চেষ্টা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হলে, সামান্য ফলাফলের দুঃখের চেয়ে আখিরাতের সাফল্য অনেক বড় পুরস্কার।
* পরীক্ষা যেমন জীবনের একটি অংশ, তেমনি এটি আমাদের ধৈর্য, পরিশ্রম ও তাকওয়ারও পরীক্ষা। ফলাফল ভালো বা খারাপ—দুটোই আল্লাহর ফায়সালা। তাই মন খারাপ না করে সামনে এগিয়ে যাও, নিয়মিত পড়াশোনা করো এবং সর্বদা আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আগামী দিনগুলো আরও উজ্জ্বল হবে ইনশাআল্লাহ।
লিখেছেন: মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা
Comments
Post a Comment