উসূলুল ফিকহের গুরুত্ব ও শেখার অপরিহার্যতা
উসূলুল ফিকহের গুরুত্ব ও শেখার অপরিহার্যতা
ভূমিকা
মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক ও ভুল, হালাল ও হারাম, ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট মানদণ্ড। ইসলাম সেই মানদণ্ডকে উপহার দিয়েছে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের মাধ্যমে। তবে এই সব দলীলকে সঠিকভাবে বুঝা, একে অপরের সাথে সমন্বয় করা এবং সেখান থেকে শরীয়াহ্র বিধান নির্ধারণ করা এতটা সহজ নয়। এজন্য দরকার একটি বিশেষ জ্ঞান – উসূলুল ফিকহ। একে বলা হয় শরীয়াহর “তাত্ত্বিক ভিত্তি” বা “আইনের মূলনীতি”।
উসূলুল ফিকহের সংজ্ঞা
“উসূল” মানে হলো ভিত্তি, মূলনীতি। আর “ফিকহ” মানে হলো ইসলামী আইন বা শরীয়াহর বিধান বোঝা। সুতরাং উসূলুল ফিকহ হলো সেই বিজ্ঞান যা শরীয়াহর উৎসসমূহ থেকে বিধান আহরণের নিয়মনীতি ও মূলনীতি নিয়ে আলোচনা করে। ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর বিখ্যাত কিতাব আর-রিসালা কে উসূলুল ফিকহের প্রাচীনতম গ্রন্থ হিসেবে ধরা হয়।
কেন শিখতে হবে?
১. উসূলুল ফিকহ শিখলে একজন আলেম কুরআন-হাদীস থেকে সঠিকভাবে দলীল বের করতে পারেন। ২. এটি ছাড়া ফতোয়া দেয়া বিপজ্জনক ও বিভ্রান্তির কারণ। ৩. যুগে যুগে নতুন সমস্যার সমাধান বের করতে হলে উসূলুল ফিকহ জানা অপরিহার্য। ৪. একে ছাড়া ইজতিহাদ অসম্ভব। ৫. বিভিন্ন মাজহাবের মতভেদ বুঝতে হলে উসূলুল ফিকহ জানা অত্যাবশ্যক।
গুরুত্ব ও ফজীলত
ইসলামের বিশাল সমুদ্র থেকে রত্ন আহরণ করার চাবিকাঠি হলো উসূলুল ফিকহ। এর মাধ্যমে বোঝা যায় কোন দলীল শক্তিশালী আর কোনটা দুর্বল, কোন হাদীস ‘আম’, কোনটা ‘খাস’, কোন আয়াত ‘নাসিখ’, আর কোনটা ‘মানসুখ’। ইমাম গাযালী (রহ.) বলেন: “উসূলুল ফিকহ হলো শরীয়াহর মূল ভিত্তি; এটি ছাড়া শরীয়াহর জ্ঞান অসম্পূর্ণ।”
কি কি উপকার পাওয়া যাবে?
✅ সঠিকভাবে কুরআন-সুন্নাহ বুঝার যোগ্যতা অর্জন করা যাবে।
✅ ফিকহী মতভেদ কেন হয়েছে, তার পেছনের যুক্তি জানা যাবে।
✅ নতুন সমস্যার সমাধান বের করা সহজ হবে।
✅ একজন আলেম ও মুফতির মধ্যে পার্থক্য তৈরি করবে।
✅ দাওয়াহ, গবেষণা ও একাডেমিক কাজের জন্য মজবুত ভিত্তি হবে।
কোথায় ব্যবহার করা যাবে?
- ফতোয়া প্রদানে। - নতুন ইস্যুতে ইজতিহাদ করতে। - ফিকহী মতভেদ মীমাংসায়। - আদালত ও ইসলামী শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নে। - গবেষণাধর্মী কিতাব রচনা ও একাডেমিক পড়াশোনায়।
কিভাবে দ্রুত আয়ত্ত করা যাবে?
১. প্রথমে সহজ কিতাব যেমন উসূলুশ-শাশী বা নূরুল আনওয়ার পড়া।
২. ধাপে ধাপে বড় কিতাব যেমন মুস্তাসফা (ইমাম গাযালী), আল-মুহাসসাল (ইমাম রাযী) পড়া।
৩. প্রতিটি উসূলের উদাহরণ কুরআন-হাদীস থেকে নেয়া।
৪. উস্তাদ বা মাশায়েখের তত্ত্বাবধানে পড়া, কারণ একা পড়লে বিভ্রান্তি হতে পারে।
৫. নিয়মিত “তালিমী মুজাকারা” করা, মানে একে অপরের সাথে আলোচনার মাধ্যমে শিখা।
৬. বাস্তব জীবনের মাসআলা সামনে রেখে অনুশীলন করা।
শেষ কথা,,
সার্বিকভাবে বলা যায়, উসূলুল ফিকহ ছাড়া শরীয়াহর জ্ঞান অর্ধেক। এটি শেখা মানে শুধু একটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহ থেকে সমগ্র শরীয়াহর সমাধান বের করার যোগ্যতা অর্জন। যুগে যুগে উলামায়ে কেরাম উসূলুল ফিকহকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। সুতরাং যারা ইসলামের গভীর জ্ঞান পেতে চান, দাওয়াহে অবদান রাখতে চান, অথবা সমাজের জন্য হালাল-হারামের বিধান নির্ধারণ করতে চান—তাদের জন্য উসূলুল ফিকহ শেখা অপরিহার্য।
লিখেছেন: মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা
Comments
Post a Comment