আমার নানু, ঠাকুরগাঁওয়ের অশ্রুবিন্দু ও মেহনতের উপাখ্যান

আমার নানু, ঠাকুরগাঁওয়ের অশ্রুবিন্দু ও মেহনতের উপাখ্যান

আলহামদুলিল্লাহ। সমস্ত প্রশংসা মহান রবের, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, ভালোবাসা দিয়ে মমতাময়ী মা'কে পাঠিয়েছেন। পূর্ববর্তী লেখায় আমি আমার শৈশব, আমার পড়ালেখা, বাবার ইন্তিকালের পর আমাদের পারিবারিক পরিস্থিতি, মায়ের আত্মত্যাগ, এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। আজ আমি পাঠকদের সামনে আমার জীবনের আরেকটি পর্ব উন্মোচন করতে চলেছি—যা আবেগ, ত্যাগ আর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।

এই অংশটি ঘিরে আছেন একজন মহান নারীর প্রতিচ্ছবি—আমার মা। তিনি এক দীর্ঘ সময় ধরে ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ে। সেই অবস্থান শুধু ভৌগোলিক অবস্থান ছিল না; ছিল এক গহীন সংগ্রাম, এক দুর্বিষহ বাস্তবতার সঙ্গে যুদ্ধ করার দৃঢ় মানসিকতা। ঠাকুরগাঁও ছিল সেই অশ্রুসিক্ত ভূমি যেখানে আমার মা তার জীবনের সবচেয়ে সোনালি সময়গুলো ব্যয় করেছেন শুধু আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।

শীতের কুয়াশা মাখা সকাল, মেশিনের পানি টেনে রান্না করা, গাছের ছায়ায় বসে দোয়া করা, আর প্রতিদিন আমার জন্য দোআতে চোখের পানিতে ভিজিয়ে ফেলা রাতগুলো—এসবই ছিল আমার মা’র নিত্যসঙ্গী। এক অচেনা শহরে এসে, প্রিয় আত্মীয়স্বজনদের ছেড়ে, শুধু সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে যিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি কেবল একজন মা-ই হতে পারেন।

ঠাকুরগাঁওয়ে তিনি আমাদের জন্য যে কষ্ট করেছেন, তা আমি কোনো লেখায় সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারবো না। তবে চেষ্টা করব কিছু স্মৃতি আর বাস্তবতার আলোকপাত করতে। সেখানে আমার নানু মানে আম্মুর ফুফু নিজের সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তায় ব্যস্ত ছিলেন না; বরং আশেপাশে যারা ছিলেন, যারা দরিদ্র, নিরুপায়—তাদের প্রতিও তিনি ছিলেন মমতাময়ী এক ছায়ার মতো। কারো সন্তান ভর্তি হয়নি, তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। কারো বাড়িতে খাবার নেই, তিনি রান্না করে দিয়েছেন।

সেই শহরে এমন কিছু মানুষ ছিলেন, যাদের ত্যাগ ও অকৃত্রিম মেহনতের কথা না বললেই নয়। তারা শুধু আত্মীয় ছিলেন না, ছিলেন আমার মায়ের আত্মিক সহযাত্রী। কারো কারো ঘরে আমরা আশ্রয় পেয়েছি, কেউ আবার সহযোগিতা করেছেন আর্থিকভাবে। তাঁদের হাতে আমার মাদ্রাসা-জীবনের সূচনাপর্ব রচিত হয়েছে।

একজন মুফতি সাহেব, যিনি বিনা দ্বিধায় আমার মায়ের কথা শুনে বলেছিলেন: “এই ছেলেটাকে মাদ্রাসায় পড়াও, ইনশাআল্লাহ একদিন দীনের খেদমত করবে।” এক মহিলা যিনি আমার মায়ের কাজের বিনিময়ে কখনো টাকা দেননি, বরং প্রতিবার বিদায়ের সময় দু'হাত তুলে দোয়া করেছেন—“আল্লাহ তোমার ছেলেকে বড় আলেম বানাক।” এইসব মুখগুলো যেন আমার মায়ের হৃদয়ে চিরকাল গাঁথা হয়ে আছে।

আজ আমি এই লেখার মাধ্যমে শুধু মায়ের ত্যাগ-তিতিক্ষার বিবরণ দিচ্ছি না, বরং সেইসব নীরব হৃদয়বান মানুষদেরও সালাম জানাচ্ছি, যাদের ওসীলায় আমি আজ দীনের পথে একটু একটু করে এগিয়ে চলেছি। তারা কেউ আর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই, কিন্তু তাদের প্রভাব আমার জীবনে সুদূরপ্রসারী।

একটা সময় ছিল, যখন মায়ের হাতে টাকা ছিল না, কিন্তু ছিল অদম্য বিশ্বাস। তিনি বলতেন—"আমার ছেলেটা একদিন দ্বীনের আলো ছড়াবে ইনশাআল্লাহ।" সেই বিশ্বাস, সেই নানুদের উপর ভর করেই তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে দিন পার করেছেন। কষ্টের ভেতরেও তার মুখে ছিল হাসি। পায়ে ব্যথা নিয়েও হেঁটেছেন, রাতে না খেয়ে থেকেও ছেলেকে খাইয়ে দিয়েছেন, আর চোখের পানিতে তাহাজ্জুদের সিজদায় ছেলেটার ভবিষ্যৎ লিখে দিয়েছেন।

এই লেখাটি যখন আমি লিখছি, তখন প্রতিটি অক্ষর যেন একটি অশ্রুবিন্দুর মতো ঝরে পড়ছে। আমার কলম থেমে যেতে চায় বারবার, কিন্তু হৃদয় বলে—“না, বলো, এই ত্যাগের ইতিহাস মানুষের সামনে তুলে ধরো। কারণ এসবই হলো বাস্তব জীবনের সাহিত্যে ভরা অধ্যায়।”

সেই ঠাকুরগাঁও, যেখানে অনেকেই শুধু এক শহরের নাম শুনে চুপ থাকেন, আমার জন্য সেটা হয়ে আছে অনুভবের এক পবিত্র ভূমি। সেখানে আমার মা একজন সেনানীর মতো যুদ্ধ করেছেন, শুধু দুনিয়ার জন্য নয়, বরং আখেরাতের জন্য।

আজও যখন আমি ঠাকুরগাঁওয়ের নাম শুনি, তখন আমার কানে ভেসে আসে আমার মা’র চুড়ির ঝঙ্কার, তার হাঁটার শব্দ, রান্নার হাঁড়ির ঢাকনার আওয়াজ, এবং তার চোখের দোয়ার পানি। সেই শহর আমার জন্য দোয়ার শহর, ত্যাগের শহর, ভালোবাসার শহর।

আল্লাহ তাআলা আমার মা'কে এই দুনিয়া ও আখেরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। এবং যেসব মানুষ আমাদের পাশে ছিলেন, যারা আমার মা’র সাথে সহযোগিতা করেছেন, যারা আমাকে দীনদার বানানোর স্বপ্নে সামিল হয়েছেন—আল্লাহ তাঁদের সবার কদমে বরকত দিন, আমীন।

লিখেছেন: মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা

নানুর বাড়ি: একটি আশ্রয়, একটি স্বপ্নের বীজতলা

যখন আমার আম্মু ঢাকা থেকে ফিরে এসে মামার বাড়িতে অবস্থান নিলেন, তখনকার সেই দিনগুলো আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে। আমি আগেই বলেছি, আমাদের ভরণপোষণ তখন কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিল। আমার মামা সীমাহীন চেষ্টা করতেন, কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক কঠিন। সেই দুঃসময়ে আমার আম্মু চলে যান ঠাকুরগাঁওয়ে, তাঁর ফুফুর বাড়িতে। সেই মহান মানুষটির নাম রেনু ইসলাম — যিনি আমার কাছে শুধুই ‘নানু’।

তিনি ছিলেন একটি প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার, যার নাম ছিল ১০৬ নং ছিটচিলারং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বাড়ির পাশেই ছিল তাঁর স্কুল। নানুর স্নেহময় আদরে এবং অক্লান্ত শ্রমে আমার ছোট্ট জীবনে এক নতুন মোড় নেয়। ঠাকুরগাঁওয়ে আসার পর তিনি আমাকে ওই স্কুলেই ক্লাস টু তে ভর্তি করিয়ে দেন। আর আম্মুও নানুর বাড়িতেই থেকে যান, ঘরের কাজকর্মে তিনি ছিলেন অগ্রগামী।

আমার নানু ছিলেন এক স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি আমার ভেতরে দেখতেন আলোর রেখা, ভবিষ্যতের দীপ্তি। তিনি তাঁর স্কুলের সকল শিক্ষিকা, যাঁদের আমরা “আপা” বলে ডাকতাম, তাঁদের সামনে আমাকে নিয়ে গর্ব করতেন। বলতেন, “এই ছেলেটা একদিন অনেক বড় কিছু হবে।” শুধু বলেই ক্ষান্ত হতেন না, প্রতিটি আপাকে অনুরোধ করতেন যেন তাঁরা আমাকে দোয়া করেন, আমাকে ভালোবাসেন।

আর তাঁরা কি অপার স্নেহে আমাকে আপন করে নেন! এখনো তাঁদের নাম আমার মনে গেঁথে আছে। সেই মমতাময়ী আপারা ছিলেন— তজিদা আপা, ফরিদা আপা, নাসরিন আপা, হাসিনা আপা, মাহবুবা আপা, রেনু আপা (আমার নানু), এবং রেবা আপা। তাঁদের প্রত্যেকের ভালোবাসা আমাকে শিকড় থেকে গেঁথে দিয়েছিল আত্মবিশ্বাসের শক্ত মাটিতে। তাঁরা শুধু শিক্ষক নন, তাঁরা ছিলেন আমার জীবনের পথপ্রদর্শক, আমার দ্বিতীয় মা।

সেই ছোট্ট ঠাকুরগাঁওয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমার নানুর গভীর আদর, আর শিক্ষিকাদের স্নেহে আমি জীবনকে দেখতে শুরু করি এক নতুন আলোয়। ছোট ছোট পা ফেলে আমি হাঁটতে শুরু করি সেই পথে—যেখানে নানুর স্বপ্ন ছিল আমার ডানায় ভর করে উড়ে যাওয়ার আশাবাদ।

আমার ছেলেবেলার স্মৃতি ও মামার সঙ্গে দিনগুলি

আলহামদুলিল্লাহ! আজ যখন ফিরে তাকাই সেই শৈশবের দিনগুলোর দিকে, তখন এক অপূর্ব প্রশান্তি ঘিরে ধরে হৃদয়জুড়ে। জীবনের শুরুটা হয়েছিল যেন এক উজ্জ্বল ভোরের মতো। আমি তখন ক্লাসে ভাল ছাত্রদের মধ্যেই একজন ছিলাম। তৃতীয় শ্রেণীতে আমি দ্বিতীয় হয়েছিলাম এবং এই ধারাবাহিকতা পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বজায় ছিল। প্রতি পরীক্ষায় আমার ফলাফল ছিল প্রশংসনীয়, যা আমাকে এবং আমার পরিবারকে আনন্দিত করত।

আমার শৈশবের সবচেয়ে কাছের সঙ্গী ছিল আমার ছোট মামা, আবিদ। যদিও তিনি আমার মামা, আমাদের বয়সের ব্যবধান ছিল এতটাই কম যে আমরা একসাথেই স্কুলে যেতাম, একসাথে প্রাইভেট পড়তাম, এমনকি খেলাধুলা পর্যন্ত করতাম একসাথে। আমাদের জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে যেন এক বন্ধুত্বের জাল বোনা ছিল—যেখানে আত্মীয়তার বন্ধনটা আমাদের বন্ধুত্বকে আরো গভীর করেছিল।

আমার নানুর তিন ছেলে—আশিক মামা, আসিফ মামা এবং আবিদ মামা। আবিদ, যিনি ছিলেন সবচেয়ে ছোট, ছিলেন আমার সহপাঠী ও সহচর। আমাদের পড়াশোনার জগৎ, স্কুলের মাঠ, খেলাধুলার আনন্দ—সব কিছুতেই আমরা একে অপরের ছায়াসঙ্গী ছিলাম। একদিনও আমাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়নি, যেন দুটো হৃদয় একসাথে ধ্বনিত হতো একই সুরে। মামা-ভাগিনার যে অটুট ভালোবাসা, তা আমাদের মাঝে ছিল এক বিরল নিদর্শন।

আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল একটি মসজিদ, যা ছিল আমাদের ইমানি জীবনের মূল কেন্দ্র। স্কুলের টিফিন সময়ে আমরা দৌঁড়ে মসজিদে যেতাম জোহরের নামাজ আদায় করতে। কেবল জোহরই নয়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই আমরা সেই মসজিদে জামাআতের সঙ্গে পড়তাম। সেই ছোট্ট বয়সে নামাজের প্রতি এই দৃঢ়তা ছিল মূলত আমাদের নানুর শিক্ষা ও প্রভাবের ফল।

আমার নানু ছিলেন এক খাস আল্লাহওয়ালা বান্দা। ধর্মপরায়ণতা তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতিটি পরতে পরতে প্রবাহিত ছিল। তিনি নিয়মিত কিতাব পড়তেন—তা হোক তাফসীর, হাদীস বা ইসলামী আদর্শ সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়। তিনি কেবল পড়তেন না, বরং তার জীবনেও সে শিক্ষাগুলো বাস্তবায়ন করতেন। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাকে দেখলে আল্লাহর কথা মনে পড়ে যেত। আমাদের ঘরের পরিবেশে তাঁর উপস্থিতিই যেন ছিল এক নীরব মাদরাসা, যেখানে আমাদের ঈমান, আকিদা, এবং আমলের বীজ বোনা হতো।

আমাদের সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও হৃদয়ে জ্বলজ্বল করে। সেই সকালে একসাথে স্কুলে যাওয়া, দুপুরে মসজিদে নামাজ, বিকেলে খেলাধুলা, সন্ধ্যায় পড়াশোনা—সবকিছু ছিল ছন্দময়, মিলনময়। আমার মনে হয়, শৈশবের সেই নির্ভেজাল দিনগুলোই হয়তো জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন, যা সময় যতই এগিয়ে যাক না কেন, তার জ্যোতি কখনো ফিকে হয় না।

এখন আবিদ মামা অনেক দূরে থাকেন, বিদেশে। কিন্তু স্মৃতির পাতায় তিনি রয়েছেন ঠিক আগের মতো। মাঝে মাঝে তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়—শুধু কণ্ঠ শুনেই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দুরন্ত ছেলেবেলার দিনগুলি, সেই খেলাধুলা, সেই হাসি, সেই দৌড়াদৌড়ি। আমি জানি, হয়তো আর কখনোই সেসব দিন ফিরে আসবে না, কিন্তু অন্তরের গভীরে তারা অমর হয়ে থাকবে চিরদিন।

আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ আমাদের সেই দিনগুলোকে বরকতময় করেছিলেন। একজন ধর্মপ্রাণ নানুর সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা, একটি ইসলামিক পরিবেশে গড়ে ওঠা এবং একজন সঙ্গীসুলভ মামার সঙ্গে জীবন শেয়ার করা—এসবই আমার শৈশবকে করেছে অনন্য ও দুর্লভ। আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাকে এমন একটি স্মৃতিপূর্ণ শৈশব উপহার দিয়েছেন।

আজও আমি যখন নামাজে দাঁড়াই, তখন সেই ছোট্ট ছেলেটার কথা মনে পড়ে—যে মামার হাত ধরে মসজিদে দৌড়ে যেত, নানুর কাছে বসে কুরআনের কথা শুনত। সেই আমিই আজ বড় হয়েছি, কিন্তু সেই ভালোবাসা, সেই শিক্ষা, সেই বন্ধন আজও আমার জীবনের পথ প্রদর্শক হয়ে আছে।

– মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা

আমার নানু: এক আলোকবর্তিকা

তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায় পূর্ণ, অন্তরের গভীরতম স্থান থেকে যার ঈমানের আলো ঝলমল করত প্রতিটি কর্মে, প্রতিটি আচরণে, প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে। আল্লাহর প্রতি তার ভালোবাসা ছিল এমন প্রবল, এমন দীপ্তিময়, যা দেখা যেত তার ইবাদতে, তার অশ্রুজলে, তার নিভৃত আরাধনায়। তিনি নামায পড়তেন এমন এক নিবিষ্টতায়, যেন জগৎ তার কাছে বিলুপ্ত হয়ে যেত, যেন তিনি একান্তভাবে রবের সান্নিধ্যে নিজেকে বিলীন করে দিতেন।

তার ইবাদতের দৃশ্য আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে দিত। কখনো কখনো ভয় হত, এমন ইবাদত করার শক্তি আমাদের হবে তো? তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতেন এমন এক তন্ময়তায়, যেন আয়াতগুলো তার হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসছে আবার সেই হৃদয়েই প্রবেশ করছে—আঁচল ভিজে যেত চোখের অশ্রুতে। তার রোজা, তাহাজ্জুদ, ইস্তেগফার, সবকিছু ছিল সুন্নাহর আলোকে পরিপূর্ণ।

খাবারের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন এক অনুপম দৃষ্টান্ত। অল্পতেই তুষ্ট থাকতেন। কখনো অপ্রয়োজনীয় খাওয়াদাওয়া করতেন না। সুন্নাহ অনুযায়ী খেতেন, ডান হাত ব্যবহার করতেন, তিন ক্বতমে পানি পান করতেন, বিসমিল্লাহ বলতেন, আলহামদুলিল্লাহ দিয়ে শেষ করতেন। তার প্রতিটি হালত, প্রতিটি অভ্যাস ছিল যেন হাদীসের জীবন্ত অনুবাদ।

তবে শুধু ইবাদতগোজার হিসেবে নয়, তিনি মানুষ হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ। সবার সঙ্গে তার আচরণ ছিল সদয়, নম্র, সহানুভূতিশীল। নানার সঙ্গে যেমন ছিলেন শ্রদ্ধাপূর্ণ ও প্রেমময়, তেমনি আমাদের সঙ্গেও ছিলেন মমতাময় ও কোমল। আমাদের সাথে কখনো রুক্ষ আচরণ করেননি, কোনোদিন চড়-থাপ্পর কিংবা রাগের শিকার হতে হয়নি। অথচ আমরা কতবার যে দুষ্টুমি করেছি, ভুল করেছি, কিন্তু তিনি ছিলেন ধৈর্যের অপার প্রতিমূর্তি। তিনি আমাদের সুশিক্ষিত, ভদ্র এবং দ্বীনদার বানানোর জন্য নিজের জীবনের মণিমাণিক্য উৎসর্গ করে দিয়েছেন।

আমি যেমন তার স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে উঠেছি, মানুষ হয়েছি, ঠিক তেমন আরও অনেক ছেলেই তার হাত ধরে মানুষ হয়েছে। অনেককে আশ্রয় দিয়েছেন, খাবার দিয়েছেন, কাপড় দিয়েছেন, দ্বীন শিখিয়েছেন, হিফজ করিয়েছেন, তালীমের পথ দেখিয়েছেন। তিনি শুধু একজন পরিবারের সদস্য ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক পরিপূর্ণ দ্বীনি নারী, যিনি সমাজে আলো বিতরণ করতেন নিঃশব্দে, বিনয় ও একাগ্রতায়।

ইউনুস—এই নামটি আজ আমার চোখে এক স্বপ্নের মতো জ্বলজ্বল করে। সে ছিল এমন এক ছেলে, যার জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন নানু। শুধু কথায় নয়, কাজে, সময়ে, অর্থে, ঘামে, ঘুমহীনতায়—তিনি ইউনুসের পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আজ ইউনুস কুরআনের আলোকে নিজের অন্তর পূর্ণ করে চলেছে।

আরেকজন মুআজ, সে আজ শায়েখ আহমাদুল্লাহ হাফিযাহুল্লাহ এর ভাইয়ের প্রতিষ্ঠিত হেফজ মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করছে। কিন্তু মুআজের এই উচ্চতায় পৌঁছানোর পিছনেও নানুর ত্যাগ, খরচ, ভালোবাসা, মেহনত, দোয়া—এসবই ছিল মূল ভিত্তি। এই যে পথ দেখানো, এই যে জান্নাতের দিকে মানুষকে চালিত করা—এটাই তো নবীসুলভ বৈশিষ্ট্য!

এমনই আরও অনেক ছেলে রয়েছে, যারা নানুর হাত ধরে নতুন জীবন পেয়েছে। তারা আজ নামায পড়ে, কুরআন পড়ে, মাদ্রাসায় যায়, দ্বীনের পথে জীবন সাজানোর চেষ্টা করে—এবং এ সবকিছুর পিছনে রয়েছে আমার নানুর অফুরন্ত মেহনতের ফসল।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই সকল ছেলেদের মাঝে আমিই ছিলাম তার সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আপন। তিনি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন—এ কথা আমি শুধু অনুভব করিনি, আমি তা দেখেছি, আমি তা পেয়েছি, আমি তা ধারণ করেছি। আমার পড়াশোনা, আমার দ্বীনি প্রগতি, আমার প্রতিটি ভালো কাজের পিছনে তার উৎসাহ, তার দোয়া, তার টাকা, তার চোখের ঘুমহীন রাত—সবকিছু মিশে আছে।

আমি আজ যে অবস্থানে আছি, যে রূপে আমি গড়ে উঠেছি—সবই নানুর বরকত। এটা কোনও সাধারণ কথা নয়, কোনও সাধারণ কৃতজ্ঞতাও নয়। এটা এক মহামূল্যবান জীবন ঋণ। একজন মানুষ, যিনি অন্য একজন মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর প্রেম জাগিয়ে তোলেন, যে মানুষটি জান্নাতের পথ দেখিয়ে দেন, যে মানুষটি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক করিয়ে দেন—তিনি শুধুই একজন নানু নন, তিনি এক আল্লাহর পাঠানো রহমত।

আল্লাহ তাআলা তার কবরকে নূরে ভরিয়ে দিন, তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ স্তরে স্থান দিন। তার প্রতিটি দোয়া, প্রতিটি চোখের অশ্রু, প্রতিটি নিঃশব্দ ভালোবাসা, প্রতিটি নিদ্রাহীন রজনী, প্রতিটি খরচ যেন তার জন্য সদাকাহ জারিয়া হয়ে থাকে। আমিন।


আমার নানু, আমার শিকড়

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই দুনিয়াকে কেবল একটি পরীক্ষাগার বানিয়ে রেখেছেন, যেখানে মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি ত্যাগ—সবই তার অনুগ্রহের একটি অংশ। আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ বান্দাদের মাধ্যমে অন্যদের জীবনকে আলোকিত করেন। আমার নানু তেমনই একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি কেবল একজন মমতাময়ী মা নন, বরং আমাদের পরিবারের জন্য তিনি ছিলেন হেদায়াতের আলো, দ্বীনের বাতিঘর।

জান্নাতের বহু পথ আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীতে রেখেছেন। আমার নানু সেই সৌভাগ্যবানদের একজন, যিনি তাঁর রেখে যাওয়া নেক সন্তান, যাঁদের তিনি হাফেজ বানিয়েছেন, আলেম বানিয়েছেন—তাঁদের দোয়ার ও সুপারিশের মাধ্যমে ইনশাআল্লাহ জান্নাতে পৌঁছে যাবেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যেভাবে দ্বীনের খেদমত করেছেন, মানুষের মাঝে আল্লাহর কথা পৌঁছে দিয়েছেন, তা আমাদের চোখে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এক উজ্জ্বল স্মৃতিস্তম্ভ।

আমার মা দীর্ঘদিন ঠাকুরগাঁওয়ে অবস্থান করেন। সেই সময় আমার নানুর ঘর হয়ে ওঠে আমাদের জ্ঞানের পাঠশালা, চরিত্র গঠনের সোনার খনি। আমার আম্মু দ্বীনের শিক্ষা গ্রহণ করেন ঠিক তার কাছ থেকেই। নামাজ, রোযা, পর্দা, আখলাক, আদব—এমনকি সাধারণ জীবনযাপনের শিষ্টাচার পর্যন্তও তিনি শিখে নিয়েছেন আমার নানুর সান্নিধ্যে থেকে। এ যেন এক সৌভাগ্য, এক রহমত, যেটি কেবল মহান প্রভু তাআলারই দান।

আমি নিজেও সেই পরিমণ্ডলের অংশ হতে পেরেছি, এ যেন আমার জীবনের অন্যতম বড় আশীর্বাদ। আমার শৈশব কেটেছে সেই পরিবারে, সেই পবিত্র পরিবেশে। সেখান থেকেই আমার বুদ্ধিবিকাশ, শিক্ষা ও চরিত্রের ভিত্তি গড়ে উঠেছে। আমি বুঝমান হয়েছি সেই বাড়িতে গিয়েই।

আমি ক্লাস টু, থ্রি, ফোর, ফাইভ পর্যন্ত শেষ করেছি ঐ এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি আমাদের পড়াশোনার তত্ত্বাবধানে ছিলেন আমাদের বড় মামা, আশিক মামা। তিনি ছিলেন আমাদের জন্য যেন এক স্নেহময় অথচ দৃঢ় এক ছায়া। আমাদেরকে আলাদা কোনো প্রাইভেট টিচারের কাছে যেতে হতো না। আশিক মামাই আমাদের জন্য ছিলেন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শিক্ষক।

তাঁর শিক্ষাদান ছিল সম্পূর্ণ হাতে-কলমে। প্রতিটি বিষয় তিনি আমাদের চোখের সামনে বুঝিয়ে দিতেন, শাসন করতেন ভালোবাসা দিয়ে, শুধরে দিতেন ভুলগুলো, এবং অনুপ্রেরণা জোগাতেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার। তাঁর শাসনের মাঝেই লুকিয়ে ছিল এক অমূল্য মমতা, ছিল ভবিষ্যৎ গঠনের এক নিঃস্বার্থ প্রয়াস। তিনি আমাদের কেবল পাঠ্যবই পড়াননি, বরং আমাদের মাঝে ভালো মানুষ হয়ে উঠার বীজ বপন করে দিয়েছেন।

প্রতিটি সকাল শুরু হতো পরিপাটি করে বই নিয়ে বসে পড়া দিয়ে, আর সন্ধ্যা নামতো দোয়া, আমল, এবং ঘরোয়া পড়ার মাঝে। আমার নানু ও মামাদের সেই ছায়াস্নেহে আমরা বেড়ে উঠেছি আল্লাহর রহমতের ছায়ায়। আমার শৈশবের স্মৃতিগুলো আজও আমার হৃদয়ে স্পষ্টভাবে অঙ্কিত, যেন কিছুদিন আগের ঘটনা।

আজ আমি যখন ফিরে তাকাই, দেখি আমার বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে নানুর স্পর্শ ছিল। তাঁর আচরণ, তাঁর দিকনির্দেশনা, তাঁর কাছ থেকে পাওয়া দ্বীনি শিক্ষা—সবকিছুই আজও আমাকে পথ দেখায়। তিনি আমাদের জন্য ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো এক রহমতস্বরূপ। আমি বিশ্বাস করি, তাঁর প্রতি আমাদের দোয়া, তাঁর সন্তানেরা যেভাবে আল্লাহর পথে জীবনকে উৎসর্গ করেছে—এগুলোই তাঁকে জান্নাতে পৌঁছে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ পাথেয়।

আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরিয়ে দিন, এবং আমাদেরকেও তাঁর আদর্শকে অনুসরণ করে জীবন গড়ার তাওফিক দিন। আমরা সবাই তাঁকে জান্নাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দোয়া করি, কারণ তিনি আমাদেরকে আল্লাহর পথে হাঁটার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, দ্বীনের সৌন্দর্য আমাদের অন্তরে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

— মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা, দ্বীনের দীপ্তি

এক জীবন, এক আলোকবর্তিকা — নানুর কথা মনে পড়ে

এই পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের জান্নাতের পথে চলার অসংখ্য দরজা খুলে রেখেছেন। কেউ সেই পথ খুঁজে পান ইলমের আলোতে, কেউ খুঁজে পান খিদমতের সৌরভে। আমাদের নানু ছিলেন তেমনই একজন সৌভাগ্যবান নারী, যিনি কেবল নিজের জন্য নয়, আমাদের মতো সন্তানদের জান্নাতের পথে চালিত করার জন্য নিজের জীবনটাকেই করে তুলেছিলেন এক অনুপম নমুনা।

তিনি রেখে গেছেন এমন কিছু উত্তরসূরি—যাঁরা আল্লাহর কিতাব কুরআনের হাফিয, দ্বীনের আলিম এবং আমলদার। তাঁর জীবন ও তার পরবর্তী প্রজন্ম যেন এক প্রবাহমান সওয়াবের ঝরনা। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের দোয়া, তাঁর সন্তানদের খিদমত ও দাওয়াতই তাঁকে জান্নাতের পথে পৌঁছে দিতে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। কারণ, তিনি আমাদেরকে আল্লাহর পথ চিনিয়েছেন, দেখিয়েছেন, এবং সেই পথে চলার শক্তি জুগিয়েছেন।

আমার আম্মু যখন তার ঘরে থাকতে শুরু করেন, তখন থেকেই তার জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। পর্দার গুরুত্ব, নামাজের সময়ানুবর্তিতা, রোযার আত্মিকতা, আচার-আচরণ, ব্যবহারিক শিষ্টাচার—সবকিছুই তিনি শিখেছেন নানুর কাছ থেকে। শুধু আম্মু নন, আমরাও শিখেছি তার সান্নিধ্যে থেকে। আমার জীবনের প্রথম পাঠশালাটি ছিল ওই পরিবার।

আমি তখন একেবারে ছোট, বুঝতে শিখছি ধীরে ধীরে। ক্লাস টু, থ্রি, ফোর, ফাইভ—সব ক্লাস আমি পাশ করেছি সেই পরিবারের সান্নিধ্যে। আমাদের স্কুল ছিল যেমন প্রশান্ত, তেমনি প্রেরণাদায়ক। কিন্তু আলাদা করে প্রাইভেট পড়ার দরকার হতো না আমাদের, কারণ আমাদের কাছে ছিলেন আশিক মামা—এক ছায়াস্বরূপ ব্যক্তিত্ব, যিনি ছিলেন আমাদের বড় মামা।

তিনি আমাদেরকে শুধু পড়াতেন না, তিনি শাসন করতেন, গড়ে তুলতেন। আমরা ভুল করলে ধমক খেতাম, ঠিক করলে প্রশংসা পেতাম। কুরআনের আরবি পড়া থেকে শুরু করে গণিতের অঙ্ক পর্যন্ত—সব তিনি নিজ হাতে শিখিয়েছেন। কখনো হালকা শাসন, কখনো গভীর আদর—এই দুইয়ের মিশ্রণে আমাদের শিক্ষা যাত্রা ছিল পরিপূর্ণ।

আজ এই দূর থেকে ফিরে তাকালে হৃদয় কাঁপে, চোখ ভিজে ওঠে। নানুর সেই অশেষ অবদান, তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আম্মুর জীবনে এনেই দেওয়া পরিপূর্ণতা—সবকিছুই যেন জান্নাতের পথের আলোকরেখা। আমি আল্লাহর কাছে হাত তুলে বলি, "হে রব! তুমি তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করো।"

আমার সৌভাগ্য, আমি এমন এক পরিবারে বড় হয়েছি, যেখানে আল্লাহর ওলীসুলভ মানুষদের সান্নিধ্য ছিল। আমার আম্মু সেই আলো নিজের মধ্যে ধারণ করে আমাদের জীবনেও ছড়িয়ে দিয়েছেন। আমাদের ঘরের বাতাসে তখন দ্বীনের সুবাস ছিল, প্রতিদিনের কথোপকথনে ছিল দোয়ার আবেদন, শিক্ষার তৃষ্ণা ও আখিরাতের চিন্তা।

আমার নানু—তিনি আমাদের কেবল একটি প্রজন্ম নয়, একটি যুগ গড়ে দিয়েছেন। আজ যখন আমি কাগজ-কলম হাতে বসি, তখন তার প্রতিটি কথা যেন হৃদয়ের গহীন থেকে উঠে আসে। আমি যদি কখনো ভালো কিছু লিখে থাকি, কিছু ভালো কাজ করে থাকি—তবে তার পিছনে আমার নানুরই হাত।

আমরা তার জন্য সদা দোয়ামান। তার প্রতি আমাদের এই ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা কোনো লেখার মধ্যে আবদ্ধ নয়—এটি একটি জীবন্ত সম্পর্ক, যার বর্ণনা কেবল অন্তরই দিতে পারে।

নানুর শিক্ষাদান ও স্মৃতিচারণ

আমার স্মৃতির পাতায় আজো স্পষ্ট খচিত সেই সোনালী দিনগুলো, যেগুলো আলোকিত করেছিল আমার শৈশব। এক দয়ালু, মমতাময়ী, অথচ কঠোরভাবে শাসনপ্রিয় রত্নের মতো একজন নারী—আমার নানু। তিনি শুধু একজন নানি ছিলেন না, ছিলেন আমার জীবনের প্রকৃত শিক্ষিকা, পথপ্রদর্শক, আর ভালোবাসার শিখর।

তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি জীবনটাকে শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। তার দোয়ার হাত আমাদের মাথায় ছিলো বলেই আমরা ছিলাম আশ্বস্ত, সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী। জান্নাতের পথে চলার বহু দিশা তিনি আমাদের সামনে খুলে দিয়েছিলেন। আজও আমরা বিশ্বাস করি, তার রেখে যাওয়া যোগ্য সন্তান এবং যেসব ছাত্র-ছাত্রী কুরআনের হিফজ করেছে কিংবা দ্বীনের পথে অগ্রসর হয়েছে, তারা তাঁর জন্য জান্নাতের সুপারিশকারী হয়ে দাঁড়াবে।

আমার আম্মু বহু দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তার কাছ থেকে। পর্দা পালন, নামাজের আদব, রোজার গুরুত্ব, মানুষের সঙ্গে ব্যবহার—এসব জীবনের মৌলিক শিক্ষা তিনি আমার আম্মুকে যেমন দিয়েছেন, আমরাও সেসব পেয়েছি। তার কাছ থেকে আমরা শিখেছি কিভাবে বিনয়ী হতে হয়, কিভাবে দয়াশীল হতে হয় এবং কিভাবে আল্লাহর বিধানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়।

আমার শৈশবের শিক্ষার ভিত্তি যে পরিবারে, সেই পরিবারই ছিল আমার নানুর পরিবার। ছোটবেলায় আমি যখন বুঝমান হতে শুরু করি, তখন থেকেই আমি ওই পরিবারে বড় হতে থাকি। আমার শিক্ষা জীবনের শুরু হয়েছিল সেখান থেকেই। ক্লাস টু, থ্রি, ফোর, ফাইভ—এই সমস্ত ক্লাস আমি শেষ করেছি নানুর ঐ প্রতিষ্ঠানে।

আমাদের আলাদা করে প্রাইভেট পড়তে হতো না। কারণ সেখানে ছিলেন আশিক মামা, যিনি ছিলেন আমাদের জন্য এক ছায়াস্বরূপ অভিভাবক। তিনি ছিলেন কঠোর কিন্তু পরিপূর্ণ মমতাময়। তিনি আমাদেরকে পড়াতেন, আমাদের শাসন করতেন এবং আমাদের প্রতিটি বিষয়ে ধরে ধরে বুঝাতেন।

তার শেখানো ছিল বিশুদ্ধ, সুশৃঙ্খল এবং গভীরতাসম্পন্ন। আমার এখনো মনে আছে, খাওয়ার আদব থেকে শুরু করে, কয়টা আঙুলে খেতে হবে, সামনে একাধিক খাবার থাকলে কোনটা আগে খেতে হবে—সবই তিনি হাতে ধরে শিখিয়েছেন। এমনকি আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য কীভাবে কথা বলা, কীভাবে চলাফেরা করা, এমনকি কিভাবে পড়ালেখা করতে হবে রুটিন অনুযায়ী—এসবও তিনি আমাদের অন্তরে গেঁথে দিয়েছেন।

তিনি ছিলেন কড়া শাসনের প্রতীক। সামান্য ভুল হলেই মুখ গম্ভীর হয়ে যেত, কিন্তু সেই কঠোরতা ছিল আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য। আজ এত বছর পরেও যখন তার সেই শাসনের কথা মনে পড়ে, তখন মনের মধ্যে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এক স্রোত বইতে থাকে। আজ আমি যে অবস্থানে পৌঁছেছি, তা তার শাসন ও স্নেহের এক অনন্য সংমিশ্রণের ফল।

একজন মানুষ যখন ছোটবেলায় এমন আদর ভরা শাসনের ছায়ায় বেড়ে ওঠে, তখন সে জীবনে পথ হারায় না। আমি সত্যিই ভাগ্যবান যে এমন একটি পরিবারে আমার বেড়ে ওঠা হয়েছে। আমি নানুর সেই শিক্ষার ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না।

তার শিক্ষা ছিল জীবনমুখী, বাস্তবভিত্তিক ও হৃদয়স্পর্শী। তিনি কখনো আমাদের কেবল মুখস্থ বিদ্যায় বিশ্বাসী হতে দেননি। বরং বলতেন, "জ্ঞান হলো আলো, আর সে আলো ব্যবহার না করলে অন্ধকারে পথ হারিয়ে যাবে।" তিনি জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে আমাদের আলোর পথ দেখিয়েছেন।

তিনি যেমন দ্বীনের শিক্ষিকা ছিলেন, তেমনি ছিলেন আদর্শ জীবনগঠনের এক অনন্য রোল মডেল। নামাজ, রোযা, দান, সদকা, পর্দা, নম্রতা, বিনয়, ধৈর্য—সবকিছু তার চরিত্রে ছিল পরিপূর্ণভাবে মিশে। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানিয়েছিলেন এবং সেই পথে আমাদেরকেও অগ্রসর করেছিলেন।

আজ যখন ফিরে তাকাই, দেখি তিনি আমাদের জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে জড়িয়ে ছিলেন। তাঁর স্নেহ, তাঁর শাসন, তাঁর শিক্ষা, সবকিছুই আজ আমাদের জীবনকে করেছে আলোকিত। আমি বিশ্বাস করি, তিনি জান্নাতের উচ্চতম মাকামে স্থান পাবেন, ইনশাআল্লাহ। আমরা সবসময়ই তাঁর জন্য দোয়া করি।

এই লেখাটির মধ্য দিয়ে আমি তাঁর স্মৃতি আর শিক্ষাকে এক বিনীত শ্রদ্ধাঞ্জলি জানালাম। এমন মানুষকে হারানো এক অপূরণীয় ক্ষতি, কিন্তু তাঁর শিক্ষা ও দোয়া আমাদের মাঝে চিরকাল বেঁচে থাকবে।

মামাদের স্মৃতিময় অধ্যায়

জীবনের কিছু মুহূর্ত থাকে, যা শত ঝড়-ঝাপটার মধ্যেও হৃদয়ের গভীরে অমলিন হয়ে থাকে। আমার শৈশবের স্মৃতিপটে যেসব মানুষ সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আশিক মামা এবং মেজ মামা। তারা ছিলেন কেবল আমাদের আত্মীয় নন, বরং আমাদের জীবনের ছায়াসঙ্গী, হাসির খনি, শিক্ষা ও আদর্শের বাতিঘর।

আশিক মামা ছিলেন আমাদের শিক্ষক, বন্ধু, এবং অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি কেবল বইয়ের পাতা পড়াতেন না; তিনি আমাদের জীবন পড়াতেন, উপলব্ধির পাঠ দিতেন। প্রতিটি বিষয় তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করতেন, যেন আমাদের মনোযোগ ছিন্ন হয় না। জটিল বিষয়গুলো সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন, কখনও গল্পে গল্পে, কখনও হাসিতে হাসিতে। তিনি হাসিখুশি মানুষ ছিলেন, আমাদের সঙ্গে অনেক মজা করতেন। এমনকি পড়ার ফাঁকে হঠাৎ হঠাৎ এমন মজার ঘটনা বলতেন, যার ফলে ক্লান্ত মনও আবার চাঙ্গা হয়ে যেত।

আমি এখনো ভুলতে পারিনি সেই মুহূর্তগুলো, যখন আমরা ঘরের মেঝেতে গোল হয়ে বসে থাকতাম, আর তিনি শুরু করতেন জীবনের অভিজ্ঞতায় ভরপুর কোনো এক কাহিনি। তাঁর কণ্ঠে ছিল উষ্ণতা, তাঁর গল্পে ছিল জীবনবোধ। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিখতাম পরিশ্রম, সাহস, ধৈর্য ও সংকল্পের গুরুত্ব। কখনো মন খারাপ থাকলে তিনিই ছিলেন আমাদের সেই একমাত্র আশ্রয়, যিনি চেষ্টা করতেন আমাদের মুখে হাসি ফুটাতে।

আজো চোখ বুজলেই তার স্মিত হাসির ছবি ভেসে ওঠে মনে। সেই উজ্জ্বল চেহারা, প্রাণবন্ত ভঙ্গিমা, আমাদের প্রতি অতলান্ত মমতা—সবই যেন আজও জীবন্ত। তার প্রতি আমার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা আজীবন বহমান থাকবে ইনশাআল্লাহ। তাঁর স্মৃতিচারণে দু’চোখ অশ্রুসজল হয়, মনে হয় যেন তিনি আজও আছেন, আমাদের মাঝেই কোথাও।

আর মেজ মামার কথা বললেই হৃদয়টা কেমন যেন আনন্দে ভরে যায়। তিনি ছিলেন হাসির রত্নভাণ্ডার। আমাদের শৈশবের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও আনন্দময় স্মৃতি তিনি। তাঁর উপস্থিতিই ছিল আমাদের প্রাণের উচ্ছ্বাস। তিনি যতক্ষণ আমাদের পাশে থাকতেন, ততক্ষণ আমাদের মনে ভয় কিংবা দুঃখের কোনো স্থানই থাকত না। কারণ তিনি নিজেই ছিলেন দুঃখ তাড়িয়ে দেওয়ার ওষুধ।

মেজ মামা পছন্দ করতেন হাসিখুশি পরিবেশ। তাঁর চেহারায় সবসময় হাসি লেগে থাকত, আর সেই হাসি ছিল সংক্রামক। যাকে দেখতেন তাকেই হাসিয়ে তুলতেন, পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তুলতেন। তিনি শুধু কথা বলতেন না, কথা বলার মাঝেই তিনি আমাদের খুশি করে দিতেন। যেন এক জীবন্ত কৌতুকনাটক আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠত তাঁর ভাষায়, অভিব্যক্তিতে।

আমাদের সঙ্গে খেলাধুলা করতেন—লুকোচুরি, লুডু, কুইজ, এমনকি পড়াশোনা নিয়েও করতেন প্রতিযোগিতা। এইসব খেলার মধ্য দিয়েই তিনি আমাদের শিক্ষা দিতেন। তার জন্য পড়ালেখা মানেই কেবল বই নয়, বরং আনন্দময় জ্ঞানার্জনের এক অসীম ভাণ্ডার। তিনি বলতেন—“শিখো, কিন্তু মজা করে শিখো।” সেই সময়গুলো ছিল সত্যিই স্বর্ণালী। তাঁর মতো খোলামেলা মানুষ খুব কমই দেখা যায়।

তিনি আমাদেরকে যেমন শাসন করতেন না, তেমনি কখনো আমাদের ওপর বিরক্ত হতেন না। যে কারণে তার আশেপাশে থাকলেই মনটা অনেক হালকা হয়ে যেত। যেন এক চুম্বকের মতো তিনি আমাদেরকে টেনে নিতেন নিজের আনন্দ-জগতে। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার সঙ্গে গল্প করতাম, হাসতাম, খেলতাম, আবার শিখতাম। এই সম্পর্কটা ছিল কেবল মামা-ভাগ্নে নয়, যেন এক অপূর্ব বন্ধুত্বের সম্পর্ক।

আজ তারা হয়তো আমাদের সঙ্গে সেই পুরনো রূপে নেই, কিন্তু তাদের স্মৃতির আলোয় আজও পথচলা উজ্জ্বল। তারা আমাদের জীবনে রেখে গেছেন এমন এক ছাপ, যা কখনো মুছে যাওয়ার নয়। তাদের শিখানো শিক্ষা, তাদের দান করা আনন্দ, তাদের হৃদয় থেকে উৎসারিত ভালোবাসা—সবই রয়ে গেছে আজীবনের জন্য সঞ্চিত।

আমি মনে করি, প্রতিটি শিশুর জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকা দরকার, যারা তাকে কেবল আদর করবে না, ভালোবাসবে না, বরং খাঁটি বন্ধুর মতো পথ দেখাবে, জীবন শেখাবে, এবং প্রাণ খুলে হাসাবে। আমার সৌভাগ্য যে আমি এমন দু’জন মামাকে পেয়েছি, যারা আমার জীবনের সোনালি অধ্যায় হয়ে আজও আমার অন্তরের গভীরে জায়গা করে আছেন।

আল্লাহ তাআলা তাদের উভয়কে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দিন, হাফিয রাখুন সব শত্রুতা থেকে, দান করুন অফুরন্ত ভালোবাসা ও রহমতের ছায়া।

স্মৃতির খাতা: আমাদের শৈশবের খেলার দিনগুলো

আমাদের শৈশবের দিনগুলো যেন ছিল এক একটি সোনালি সকাল, প্রতিটি মুহূর্তে ছিল প্রাণের স্পন্দন। বিশেষ করে আসরের নামাজের পর যখন খেলার সময় হতো, তখন যেন আমাদের জীবন জেগে উঠত এক ভিন্ন আনন্দে। আমাদের সেই দিনগুলোতে খেলার মাঠে শুধু আমরা নয়, আমাদের প্রিয় মামারা—বড় মামা, মেজ মামা—সবাই অংশগ্রহণ করতেন। খেলাধুলার আনন্দে আমরা কখনোই একা থাকতাম না, বরং আমাদের স্কুলের বন্ধুরাও আসত এবং আশপাশের এলাকার অনেক ছেলেও খেলার সঙ্গী হতো।

ক্রিকেট, ফুটবল, দৌড়ঝাঁপ—সব খেলাতেই ছিল প্রাণচাঞ্চল্য। মাঠে নামলেই শুরু হতো প্রাণভরা হইহুল্লোড়। মামারা আমাদের সঙ্গে একইভাবে মিশে যেতেন। এমনকি মাগরিব পর্যন্ত তারা আমাদের সঙ্গে খেলতেন—মাঝে মাঝে হার মানতেন আমাদের কৌশলের কাছে, আর আমরা গর্বে ফুলে উঠতাম। বৃষ্টির দিনে সেই খেলার আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে যেত। মামা আমাদের উৎসাহ দিতেন বৃষ্টিতে নেমে ফুটবল খেলতে, আর আমরা সেদিন পুরো ভিজে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে যেতাম। খেলার মাঠে ভিজে মাটি, স্লিপ করে পড়ে যাওয়ার হাস্যকর দৃশ্য—সব মিলিয়ে সেটা ছিল এক অমলিন স্মৃতির রঙিন ক্যানভাস।

এভাবেই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। এক সময় আমরা ধাপে ধাপে এগিয়ে চলছিলাম। ফাইভ পর্যন্ত শেষ করলাম এই আনন্দঘন পরিবেশেই। কিন্তু খেলাধুলা আর পড়াশোনার বাইরে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় ছিল আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেবের সঙ্গে সম্পর্ক। তিনি ছিলেন আমাদের শিক্ষক, পথপ্রদর্শক ও গল্পের জাদুকর। তিনি আমাদের কুরআন শেখাতেন, নামাজের আদব শেখাতেন এবং ফাঁকে ফাঁকে জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গল্প করে আমাদের হৃদয় জয় করে নিতেন। তাঁর মুখে গল্প শুনতে শুনতে আমরা বুঝতেই পারতাম না কখন এশার আযান হয়ে গেছে।

ইমাম সাহেবের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ছিল গভীর। তিনি শুধু একজন আলেম নন, আমাদের শৈশবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর প্রতিটি কথা, প্রতিটি উপদেশ আজও কানে বাজে। এমন মানুষদের উপস্থিতিই একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলে, আলোর পথে পরিচালিত করে।

আমাদের শৈশবের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বন্ধুত্ব। আমরা ছিলাম এক বিশাল বন্ধু-বৃত্তের অংশ। আবিদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল মুমিন, আর আমার আপন বন্ধুর নাম ছিল রুবাই। শুধু তারাই নয়, আমাদের আরও অনেক প্রিয় সঙ্গী ছিল। যেমন সাগর, ফজলে রাব্বি, মিন্টু, সিয়াম, শাহেদ, নাফিস, নয়ন, শিহাব, রাহাত, মিম—এখন অনেকের নাম স্মরণে নেই, কিন্তু তারা প্রত্যেকেই আমাদের শৈশবের পাতায় অমলিনভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে আছেন।

আমরা সবাই একসাথে খেলতাম, হাসতাম, কখনো ঝগড়া করতাম আবার পরক্ষণেই মিলে যেতাম। বন্ধুত্ব ছিল অকৃত্রিম। আমাদের জীবনের একেকটা দিন ছিল যেন একেকটা রঙিন অধ্যায়, যেগুলো আজও আমাদের মনকে তাজা করে তোলে।

কখনো ভাবিনি, সেই দিনগুলো এত দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। আজকের এই ব্যস্ত জীবনে দাঁড়িয়ে পিছনে ফিরে তাকালে সেই সময়গুলোকেই সবচেয়ে বেশি মিস করি। খেলাধুলা, বন্ধুত্ব, শাসন, আদর, বৃষ্টিতে ভেজা ফুটবল—সবকিছু মিলে এক অপূর্ব শৈশবের সুরভিত উপাখ্যান। এই স্মৃতিগুলোই হয়তো আমাদের আজকের মানুষ হয়ে ওঠার ভিত্তি।

শৈশবের সেই দিনগুলো ফিরে আসবে না, কিন্তু স্মৃতির পাতায় তারা চিরকাল জেগে থাকবে, আমাদের হাসাবে, কাঁদাবে, আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখাবে। এটাই তো জীবনের সৌন্দর্য।

শৈশবের স্মৃতিময় দিনগুলি

আমাদের জীবনের সবচেয়ে মধুর সময় ছিল সেই শৈশবকাল, যা আমরা কাটিয়েছি পরিবার, বন্ধু আর আনন্দে ভরা পরিবেশে। আমাদের বাড়ির একটি বিশেষ দিক ছিল—সেখানে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখতেন আমার প্রিয় নানু। তিনি শুধু আমাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য নন, এলাকার অনেক ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যও ছিলেন শিক্ষাদানের উজ্জ্বল বাতিঘর। নানুর কাছে প্রাইভেট পড়তে আসতেন আমাদের অনেক ছাত্র ভাই ও বান্ধবীরা।

নানুর পড়ানোর ধরন ছিল এতটাই সহজ, পরিষ্কার ও হৃদয়গ্রাহী যে, একজন ছাত্র একবার পড়লে দ্বিতীয়বার আর পড়ার প্রয়োজন হতো না। বিশেষ করে ইংরেজি ও ধর্ম ক্লাসে তাঁর দক্ষতা ছিল অবিস্মরণীয়। তিনি আমাদের মনে এমনভাবে বিষয়গুলো গেঁথে দিতেন যেন জ্ঞানের কুঁড়ি অঙ্কুরিত হয়ে পূর্ণ ফুলে রূপান্তরিত হতো। আমরা সকলে নানুর ক্লাসগুলো খুব আগ্রহ নিয়ে করতাম এবং তাঁর নির্দেশনায় ভালোভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতাম।

শুধু পড়াশোনাই নয়, আমাদের বাড়িটি ছিল আতিথেয়তার দৃষ্টান্ত। যে-ই আসুক না কেন, নানু নিজ হাতে চা-নাস্তা বানিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এমনকি কেউ দুপুরে এলে ভাতের ব্যবস্থাও থাকত। কখনো কখনো কোনো বন্ধু বা বান্ধবী রাতে থেকে যেত, তখন তাদের জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা থাকত। একসাথে থাকা, খাওয়া-দাওয়া আর মজার গল্পে রাত পার করে দিতাম। পরীক্ষার আগে তো যেন উৎসব বয়ে যেত, সবাই একসাথে থাকতাম, পড়াশোনার মাঝে খুনসুটি, গল্প, রাতজাগা আনন্দে মুখর হয়ে উঠত প্রতিটি ক্ষণ।

সেইসব দিনগুলোতে আমি আরও একধাপ এগিয়ে যাই। একপর্যায়ে আমাদের সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আমরা অনেক প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিই। আমি ৫.০০ এর মধ্যে ৪.৮৩ জিপিএ পেয়ে উত্তীর্ণ হই, শুধু ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বিষয়টিতে এ প্লাস না পাওয়ায় সামগ্রিক এ+ অর্জন করতে পারিনি। তবে ওই ফলাফলের পেছনে যে ভালোবাসা, যে শিক্ষা, যে স্মৃতি তা আজও আমাকে মুগ্ধ করে রাখে। ফলাফল শুধু সংখ্যা নয়—এই সংখ্যার পেছনে ছিল এক বাড়ি ভালোবাসা, এক নানু-নাতির বন্ধন, এক পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের সহযোগিতা, সম্মিলিত প্রয়াস আর অকৃত্রিম আন্তরিকতা।

আজ যখন আমি পিছন ফিরে তাকাই, তখন স্পষ্ট দেখতে পাই সেই চেনা মুখগুলো—বন্ধুরা, প্রিয় শিক্ষক, মসজিদের ইমাম সাহেব, বড় মামা, মেজ মামা—সবার স্মৃতি আমাকে অশ্রুসজল করে তোলে। আমাদের খেলার মাঠ, ফুটবল, ক্রিকেট, বৃষ্টির ভেজা আনন্দ, বৃষ্টিতে কাদায় গড়াগড়ি দেওয়া—সবকিছু যেন সোনালি অতীতের পাতায় লেখা এক মহাকাব্য।

নানুর স্মৃতি, আমাদের ছেলেবেলা ও পাঠশালা

নানুর প্রাইভেট পড়ানো ও ভালোবাসা

আমাদের অনেক ছাত্র ভাই, বন্ধু এবং বান্ধবী – তারা আমাদের বাসায় এসে প্রাইভেট পড়তো আমার নানুর কাছে। আমার নানু তাদেরকে এমনভাবে পড়াতেন, যেন একবার পড়ালেই যথেষ্ট হতো। তাঁর পাঠদানের পদ্ধতি এতটাই সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় ছিল যে দ্বিতীয়বার সেই বিষয়টি পড়ার প্রয়োজন হতো না।

বিশেষ করে তিনি স্কুলে ইংরেজি ও ধর্ম ক্লাস নিতেন। আমরা সবাই অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে সেই ক্লাসগুলো করতাম, আর ভালোভাবে পড়াশোনা করতাম।

আপ্যায়নের ঐতিহ্য

নানুর বাড়িতে আপ্যায়নের অভাব ছিল না। যে কোনো সময় যে কোনো বন্ধু বাসায় আসত, নানু তার জন্য চা-নাস্তা থেকে শুরু করে ভাত পর্যন্ত ব্যবস্থা করতেন। রাতে থাকার ব্যবস্থাও ছিল, যেন পড়াশোনার ব্যাঘাত না ঘটে।

পরীক্ষার আগে আমাদের প্রায় সব বন্ধু একসাথে থাকতাম। আমাদের জন্য একটি আলাদা ঘর বরাদ্দ ছিল, যেখানে আমরা মজা করতাম, খেলাধুলা করতাম, একসাথে পড়তাম ও খেতাম।

সমাপনী ও ফলাফল

এইভাবে একসময় আমার সমাপনী পরীক্ষা হয়। আমি ৪.৮৩ জিপিএ পাই। যদিও "বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়" বিষয়ে A+ না পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে A+ আসেনি, তবুও আমি খুব হতাশ হইনি।

আমি মনে করি, সেই সময়কার স্মৃতিগুলোই অনেক বেশি মূল্যবান ছিল – শুধুমাত্র ফলাফল নয়, বরং শিখন-অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, আর ভালোবাসার বন্ধন ছিল আমাদের প্রকৃত অর্জন।

নতুন স্কুলে যাত্রা

এরপর যখন আমি ক্লাস সিক্সে উঠি, তখন নানু আমাকে এবং আবিদ মামাকে "মথুরাপুর পাবলিক হাই স্কুল"-এ ভর্তি করান। আমরা সেখানে একসাথে ভর্তি হই এবং প্রাইভেট পড়তে শুরু করি এক স্যারের কাছে। নতুন স্কুলেও দিনকাল ভালোই যাচ্ছিল, এবং পড়াশোনাতেও আমরা মনোযোগী ছিলাম।

নানাভাইয়ের স্মৃতি ও সংগ্রাম

আমার নানাভাইয়ের কথা না বললেই নয়। আমি যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি, তখন তিনি একদিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়েন। তাঁর পা ভেঙে যায়, এবং পরে অপারেশনের মাধ্যমে তাঁর পায়ের মধ্যে রড বসানো হয়। এরপর থেকে তিনি পা বাঁকা করতে পারতেন না।

এই কষ্ট নিয়েই তিনি জীবন কাটিয়েছেন, এবং আমাদের জন্য সেই সংগ্রামী জীবনের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। আমার নানু তাঁর যথার্থ সেবা ও খেদমত করতেন, আর আমরাও চেষ্টা করতাম সেই খেদমতে শরিক হতে।

নানাভাই অনেক মজার মানুষ ছিলেন। তিনি শরীরের কষ্টের মাঝেও আমাদের সাথে হাসতেন, খেলতেন, আর জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো আমাদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন।

© ২০২৫ | মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা

স্মৃতির পাতায় আমার শৈশব ও মাদ্রাসায় যাওয়ার গল্প

মানুষ যা পেছনে ফেলে আসে, তার সবই স্মৃতি হয়ে যায়। কষ্টগুলো একসময় থিতিয়ে পড়ে, আর সেই জায়গা জুড়ে নেয় অভিজ্ঞতার আলো। আমিও আমার জীবনের এমন কিছু স্মৃতির কথা বলতে বসেছি, যা এখনো আমার হৃদয়ের পাতায় অমলিন হয়ে আছে।

আমি যখন ক্লাস সিক্সে উঠলাম, তখন আমার নানু আমাকে এবং আবিদ মামাকে ভর্তি করে দিলেন মথুরাপুর পাবলিক হাই স্কুলে। আমরা দুজনই ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম এবং প্রাইভেট পড়তে শুরু করলাম এক স্যারের কাছে। তখনকার দিনগুলো খুবই আনন্দময় ছিল। নিয়মিত পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা—সবকিছুই যেন জীবনের সোনালি অধ্যায়।

তবে সেই আনন্দময় জীবনে একটা দুঃখের ছায়াও ছিল। আমি যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি, তখন আমার নানা ভাই একদিন মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট করে ফেলেন। তার পা ভেঙে যায়। অনেক কষ্টে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, অপারেশন করা হয় এবং তার পায়ে রড বসানো হয়। এরপর তিনি আর কখনো পা পুরোপুরি বাঁকা করতে পারেননি। এক অদ্ভুত বেদনায়, অথচ অদম্য মানসিক শক্তিতে তিনি বাকিটা জীবন পার করেছেন।

আমাদের নানু ছিলেন একজন উদার মনের নারী। তিনি স্বামীর প্রতি হক আদায়ে ছিলেন অবিচল। ছোট-বড় সব কাজে তিনি নানার সেবা করতেন, আর আমরা, নাতি-নাতনিরাও চেষ্টা করতাম সাহায্য করতে, সেবা করতে। নানা ভাই ছিলেন রাগী মানুষ, কিন্তু ভেতরে ভীষণ নরম হৃদয়ের। তিনি প্রায়ই আমাদের সাথে হাস্যরস করতেন, গল্প করতেন। এমনকি অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি কখনো ভালোবাসা দিতে কার্পণ্য করেননি।

"নানা ভাইকে আমরা যতটা ভয় পেতাম, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসতাম।"

সময় চলে যায় নিজের নিয়মে। আমাদের অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলো। তার পরের সময়টা ছিল রমজান মাস। ঠিক তখনই আমার জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার মতো একটা ঘটনা ঘটে। আমাদের এলাকায় এক হাফিজ সাহেব বগুড়া থেকে এসে মসজিদে তারাবী নামাজ পড়াতে আসেন। তিনি শুধু তারাবি পড়াতেন না, বরং ফজরের পর ছোট ছোট ছেলেদের নিয়ে ঘোরাঘুরি করতেন, গল্প করতেন, নসিহত করতেন।

তিনি আমাদের কুরআনের কথা শোনাতেন, হাদীসের কথা শোনাতেন। বলতেন:

“তোমরা নিয়মিত নামাজ পড়ো, ভালো ব্যবহার করো, মা-বাবার কথা মানো।”

হাফিজ সাহেব আমাদেরকে হাফেজ হবার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। বলতেন, “স্কুল-কলেজ পড়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হবে না, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দরকার দ্বীনের ইলম।”

তার সেই কথাগুলো যেন আমার হৃদয়ে সাঁড়াশির মতো আঁচড় কেটে বসলো। আমার মন-প্রাণে একটা জেদ তৈরি হলো। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম— যে করেই হোক, আমাকে মাদ্রাসায় ভর্তি হতে হবে। আমি হাফেজ হবই হব।

তখন থেকেই আমার জীবনের রঙ বদলাতে শুরু করলো। খেলাধুলার চেয়ে কুরআন মুখস্থ করাই আমার কাছে বড় হয়ে উঠলো। মাদ্রাসা ছিল যেন আলোর খোঁজে এক নতুন যাত্রা। অজানা অচেনা সেই জগতে পা রেখে আমি পেয়েছি জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা।

আজ আমি যেখানেই আছি, যেমনই আছি, সব কিছুর পেছনে সেই এক হাফিজ সাহেবের কথাগুলো, আমার নানুর আদর্শ, আর নানা ভাইয়ের দৃঢ়তা আমাকে গড়ে তুলেছে। সেইসব মানুষগুলো আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ।

মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার স্মৃতি

আমরা নানা ভাইকে অনেক ভয় পেতাম, কারণ নানা ভাইয়ের অনেক রাগ ছিল। একটু কিছু হলেই তিনি অনেক রাগ হয়ে যেতেন। আমরা সবসময় সতর্ক হয়ে চলাফেরা করতাম যাতে কখনো তার মনে আঘাত না লাগে।

যখন আমি হাই স্কুলে ভর্তি হলাম এবং অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলো ছয় মাস পর, তখন রমজান মাস এলো। সেই সময় আমার ভিতরে মাদ্রাসায় পড়ার আগ্রহ জন্মাল। আমাদের মসজিদে বগুড়া থেকে একজন হাফেজ সাহেব হুজুর তারাবির জন্য এসেছিলেন। তিনি ফজরের পর আমাদের এলাকার ছোট ছোট ছেলেদের নিয়ে ঘুরতে যেতেন, গল্প করতেন, কুরআনের কথা শুনাতেন, হাদিসের আলোচনাও করতেন। তিনি সব সময় নসিহত করতেন: “তোমরাও কুরআন পড়ো, হাদিস পড়ো, নিয়মিত নামাজ আদায় করো, এবং ভালো ব্যবহার করো।”

তিনি বলতেন, “তোমরা হাফেজ হও, মাদ্রাসায় ভর্তি হও। স্কুল-কলেজে পড়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা কঠিন।” তখন এই কথাগুলো আমার মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। মনে হলো, ‘আমি হাফেজ হবই, যেকোনো মূল্যে।’

সেদিনই আমি বাসায় গিয়ে আম্মুকে বললাম, “আম্মু, আমি আর স্কুলে পড়বো না। আমি এখন মাদ্রাসায় ভর্তি হব।”

আমার আম্মু এই কথা আমার নানুকে বললে, নানু অনেক খুশি হয়ে বললেন, “এই আশাই তো করেছিলাম, মুনীর মাদ্রাসায় ভর্তি হবে। আমি তো শুরু থেকেই ঠিক করেছি, মুনীরকে মাদ্রাসায় পড়াবো, সে দ্বীন শিখবে।”

পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাকে ঠাকুরগাঁওয়ের লক্ষ্মীপুর এলাকার একটি আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু হঠাৎ আমার বড় মামা, আশিক মামা (যিনি ঢাকায় থাকেন) ফোন করে বললেন, “আমি ঢাকায় একটা নতুন মাদ্রাসায় ভর্তি করাবো, ওখানে এক ওস্তাদের সাথে আমার পরিচয় আছে।”

মামা ঐ রাতেই রওনা দিলেন এবং পরদিন সকালে আমাদের বাসায় পৌঁছলেন। সারাদিন আমাকে প্রয়োজনীয় জামা-কাপড়, বই-পত্র, জিনিসপত্র কিনে দিলেন। তারপর রাতে আমাকে এবং আবিদকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।

আমরা গিয়ে পৌঁছলাম সেই মাদ্রাসায়, যার নাম “মারকাজুল ইলমি ওয়াদ দাওয়াহ বাংলাদেশ, গেন্ডা, সাভার, ঢাকা।” এখানে গিয়েই মামা আমাকে মক্তবে ভর্তি করিয়ে দিলেন।

আমার দ্বীনি যাত্রার শুরু

জীবনের বাঁকে বাঁকে কিছু সিদ্ধান্ত এমন থাকে, যা একটিমাত্র সন্ধিক্ষণে পুরো জীবনের গতিপথ পাল্টে দিতে পারে। ঠিক তেমনি এক শুভক্ষণে আমি ঘোষণা দিলাম — "আম্মু, আমি আর স্কুলে পড়বো না। আমি এখন মাদ্রাসায় ভর্তি হব।"

আমার এ কথা শুনে আম্মু প্রথমে একটু চমকে গেলেন, কিন্তু পরক্ষণেই তা পৌঁছে দিলেন আমার নানুর কাছে। নানু যেন এমন একটা খবরের প্রতীক্ষাতেই ছিলেন। আনন্দে মুখ উজ্জ্বল করে বললেন, "এই কথাটিই তো আমি আশা করছিলাম! আমার মুনীর মাদ্রাসায় যাবে — এটাই তো আমার স্বপ্ন ছিল!"

কথা অনুযায়ী কাজ। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, আমাকে ঠাকুরগাঁও জেলার লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের একটি আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হবে। সেই মুহূর্তে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আমার পরিবার — আমাকে আল্লাহর দ্বীনের রাহে পরিচালিত করবে। কিন্তু তখনই একটি মোড় ঘুরল আমার জীবনে।

আমার বড় মামা, আশিক মামা, যিনি ঢাকায় থাকেন, ফোন করে জানালেন, "আম্মা, আমি মুনীরকে ঢাকায় একটি ভালো মাদ্রাসায় ভর্তি করাবো।" মামার পরিচিত একজন ওস্তাদ ছিলেন সেই মাদ্রাসায়, যার প্রতি মামার ছিল পরম আস্থা ও ভালোবাসা। সিদ্ধান্ত হলো — আমি ঢাকা যাচ্ছি!

সেই রাতেই মামা রওনা দিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের পথে। পরদিন সকালে এসে পৌঁছালেন বাসায়। সারাদিন আমাকে সঙ্গে নিয়ে মার্কেটে ঘুরলেন। মাদ্রাসার উপযোগী জামাকাপড়, ওড়না, চাদর, টুপি — সবকিছু কেনা হলো। রাতে আমি ও আমার চাচাতো ভাই আবিদ — মামার সঙ্গী হলাম। যাত্রা হলো এক নবীন দ্বীনি অধ্যায়ের দিকে।

গন্তব্য: গেন্ডা, সাভার, ঢাকা। মাদ্রাসার নাম — মারকাযুল ইলমি ওয়াদ দাওয়াহ বাংলাদেশ। এটি ছিল এক নবপ্রতিষ্ঠিত দ্বীনি প্রতিষ্ঠান, যার পরিবেশ ছিল পরিপূর্ণ দ্বীনি সৌরভে ভরা।

সেখানে গিয়ে প্রথমে আমাকে নেওয়া হলো হিফজখানায়। হাফেজ সাহেব বললেন, "তোমাকে আগে মক্তবে পড়তে হবে।" অতঃপর ভর্তি হলো আমার নতুন জীবনপর্বের সূচনা — মক্তব শিক্ষা।

আশিক মামার সাথে যেই ওস্তাদের সম্পর্ক ছিল, তার নাম মুফতি আব্দুস শাকুর। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সদয়, মার্জিত এবং পরহেযগার। তাঁর সান্নিধ্য পেয়ে আমি ধাপে ধাপে আগাতে থাকলাম। মাদ্রাসার পরিবেশ, দরসে কুরআনের আলো, সহপাঠীদের আন্তরিকতা — এসব মিলিয়ে আমার হৃদয়ে এক নতুন জগৎ উন্মোচিত হলো।

আমার নানু, মামারা, বিশেষ করে ঠাকুরগাঁওয়ের পরিবারের অবদান আমি আজও ভুলতে পারি না। তারা আমাকে যথার্থ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, আমার জন্য পরিশ্রম করেছেন, ভালো চেয়েছেন। আমি তো তখন কিছুই ছিলাম না — না অর্থ, না মেধা। কিন্তু তারা কখনো আমার প্রতি অবহেলা করেননি। তারা আমার জন্য ছিলেন ছায়া হয়ে। আশীর্বাদ হয়ে।

আমি আজও মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করি যে তিনি আমাকে এমন একটি পরিবারে জন্ম দিয়েছেন, যারা দ্বীনের পথে চালিত করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। আমার মামারা, আমার নানু, আমার আম্মু — তারা সবাই চেয়েছেন আমি যেন বড় হয়ে একজন আলেম হই, সমাজের জন্য সেবক হই, দ্বীনের খাদেম হই।

আজও পর্যন্ত তারা আমার খোঁজ রাখেন, ফোন করেন, দোয়া করেন। তাদের চোখে আজও স্বপ্ন — "আমাদের মুনীর একদিন অনেক বড় আলেম হবে।" আমি তাদের সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছি। প্রতিটি ইলমের ক্লাসে, প্রতিটি কিতাবের পৃষ্ঠায় আমি খুঁজে ফিরি সেই প্রেরণা — যেটা আমার পরিবার আমাতে রোপণ করেছে।

এভাবেই শুরু আমার দীনি যাত্রার। এটা কেবল একজন ছাত্রের জীবন নয়, বরং হাজারো পরিবারের আশা-ভরসার প্রতীক। একটি ছোট্ট সিদ্ধান্ত থেকে জন্ম নিতে পারে বিশাল এক অধ্যায় — যদি পাশে থাকে এমন কিছু মানুষ, যারা নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। আর থাকে একজন খোদাভীরু পথপ্রদর্শক — যে তোমাকে নিয়ে যেতে চায় জান্নাতের পথে।

আমি আজ তোমাদের সামনে এমন কিছু কথা বলতে চাই যা আমার অন্তর থেকে গভীর ভাবে বেরিয়ে আসছে। আমার জীবনের অনেক কঠিন সময়ে যে মানুষগুলো পাশে দাঁড়িয়েছে, আমি তাদের প্রতি আজীবন ঋণী। তারা আমার জন্য কেয়ামতের আগ পর্যন্ত ঋণী থাকবে, আর এই ঋণ কখনো শোধ হবে না। বিশেষ করে আমার বোন এবং তার বন্ধুদের কথা বলছি যারা আমার অসুস্থতার সময়, যখন আমি সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় ছিলাম, তখনই তাদের সহযোগিতা এবং ভালোবাসার হাত বাড়িয়েছিল।

জীবনে অনেকবার এমন মুহূর্ত আসে যখন আমরা হতাশ, ক্লান্ত, এবং একাকী বোধ করি। আমার জীবনের সেই সময়গুলোতে তারা আমার পাশে ছিল। তাদের সাহচর্যে, তাদের দোয়ায় এবং সহযোগিতায় আমি সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। আমার বোনের বন্ধুদের প্রতিটি সাহায্য, তাদের একান্ত আন্তরিকতা, আমার জন্য ছিল এক অমূল্য উপহার। আল্লাহ যেন তাদের পরিবারকে এমন সফলতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি দান করেন যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।

আমার নানা ভাইদের জন্যও আমি বিশেষ দোয়া করি। তারা এখন আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাদের স্মৃতি আমার হৃদয়ে অম্লান। আমি দোয়া করি, আল্লাহ তাদের কবরকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সুশোভিত একটি স্থান বানান, যেখানে তারা চির শান্তিতে থাকবেন। এই পৃথিবীর যে ব্যস্ততা ও কঠোরতা ছিল, আল্লাহ তাদের জন্য সেখানে এক চিরস্থায়ী স্বর্গীয় শান্তি প্রদান করুন।

আল্লাহ তাদের সম্পদে বরকত দান করুন, যেন তাদের সন্তানরা সৎ পথে চলতে পারে, সমাজের কল্যাণে অবদান রাখতে পারে। আমি প্রার্থনা করি, তাদের পরিবার যেন আল্লাহর নিকট কবুলযোগ্য হয় এবং তারা ইসলামের পথে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হতে পারে। আল্লাহ যেন তাদের জীবন ও কাজকে বরকতপূর্ণ করে দেন, যেন তাদের মাধ্যমে উম্মাহর সেবা আরও বিস্তৃত হয় এবং তাদের সৎ সন্তানরা সৎ পথে চলার জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারে।

আমাদের জীবন নানা রঙে রাঙা, নানা অভিজ্ঞতার সমাহার। সুখের সঙ্গে থাকে দুঃখ, হাসির সঙ্গে অশ্রু। তবুও, ভালো মানুষের সাহচর্য আমাদের শক্তি দেয়, আমাদের পথ আলোকিত করে। আমার বোন এবং তার বন্ধুরা সেই আলোর দীপ হয়ে আমার জীবনে জ্বলেছে। তারা শুধু আমার জন্য নয়, তাদের চারপাশের মানুষদের জন্যও আশার বাতি। তাদের ভালোবাসা ও দোয়া আমার জন্য অবিস্মরণীয়। আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ তাদের জন্য বহু উত্তম পুরস্কার রেখেছেন, কারণ তারা তাদের হৃদয় দিয়ে আমাকে সহায়তা করেছে, দুঃখের সময় আমার পাশে দাঁড়িয়েছে।

জীবন কখনো আমাদের মন মতো হয় না। আমরা অনেক সময় হতাশ হই, ভেঙে পড়ি, মনে করি আর চলতে পারব না। কিন্তু সেই সময় পাশে কেউ থাকলে, বিশেষ করে যারা অকৃত্রিম ভালোবাসা দিয়ে সাহায্য করে, তখন জীবন আবার নতুন করে সুন্দর হয়ে ওঠে। আমার জীবনের সেই দুঃসময়ে যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল, তাদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।

আমাদের এই পৃথিবী একটি পরীক্ষার ময়দান। এখানে মানুষ আসে নানা রূপে, নানা অবস্থায়। কেউ শক্তিশালী, কেউ দুর্বল; কেউ সুখী, কেউ দুঃখী। কিন্তু সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মানুষের প্রতি মানবিকতা, ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা। আমার বোন এবং তার বন্ধুদের মাধ্যমে আমি এই শিক্ষাটি পেয়েছি। তারা আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে সংকটে ধৈর্য ধরতে হয়, কীভাবে প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।

তাদের সাহায্য ছাড়া আমি আজ এখানে থাকতে পারতাম না। তাদের প্রার্থনা, তাদের ভালোবাসা, তাদের অকৃত্রিম সেবা আমাকে জীবনের পথে দৃঢ় করে তুলেছে। আল্লাহ যেন তাদের সকল ভালো কাজের প্রতিদান এই দুনিয়া ও আখিরাতে দান করেন।

আমি আশা করি, এই দোয়ায় আমি শুধু তাদের জন্যই নয়, তাদের পুরো পরিবার, তাদের সন্তানদের জন্যও ভালোবাসা ও বরকত কামনা করছি। যেন তারা সবাই আল্লাহর নৈকট্যে উত্তম স্থান পায়, তাদের জীবন সুখময় হয় এবং তারা ভালো মানুষ হয়ে সমাজের কল্যাণে অবদান রাখতে পারে। আমাদের জন্য যারা ভালোবাসার হাত বাড়িয়েছে, তারা যেন সবসময় আল্লাহর রহমতে সুস্থ, সুখী ও সমৃদ্ধ হয়।

আমরা যখন আমাদের জীবনের সংগ্রাম দেখি, তখন বুঝি সাহায্য এবং স্নেহের গুরুত্ব কত বড়। সাহায্য পাওয়া শুধু আর্থিক নয়, মানসিক শক্তিও দেয়। আমার বোন এবং তার বন্ধুদের ভালোবাসা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সহায়ক। আমি তাদের জন্য দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাদের জন্য সুখ, শান্তি এবং কল্যাণ বর্ষিত করেন।

আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকে যারা আমাদের সাহায্যের জন্য নিরলস কাজ করে যায়। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের কর্তব্য। আমি আমার বোন এবং তার বন্ধুদের কাছে আজীবন ঋণী, কারণ তারা আমাকে দুঃসময়ে সহায়তা করেছে, আমার জন্য দোয়া করেছে, আমাকে নতুন জীবনের পথে পরিচালিত করেছে।

আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ভালোবাসা, দয়া এবং মানবতা। আমার বোন ও তার বন্ধুরা আমার জীবনে সেই সম্পদের আলোকবর্তিকা। আমি আশা করি তাদের ভালোবাসা ও সাহায্য যেন তাদের জীবনে ফিরে আসে বহুগুণে। আল্লাহ যেন তাদের সকল ইচ্ছা পূরণ করেন এবং তাদের জীবনকে সুখে পরিপূর্ণ করেন।

জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন আমরা নিজেরাই হাল ছেড়ে দিতে চাই, কিন্তু তখনই ভালো মানুষের সাহায্য ও প্রার্থনা আমাদের শক্তি জোগায়। আমার বোন এবং তার বন্ধুরা সেই শক্তি আমার জীবনে। তাদের সাহায্য আমার জীবনের প্রতিটি অন্ধকার দূর করেছে, আমাকে আলোর পথে নিয়ে এসেছে।

সুতরাং, আমি আজ এখানে তাদের জন্য দোয়া করতে চাই। আল্লাহ তাদের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখুন, তাদের জীবনকে শান্তিময় করুন, তাদের সফলতা দিন। আমি আশা করি, তারা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর দয়ায় অভিষিক্ত হোক এবং তারা সকলেই সুখী হোক।

আমার জীবনের যেসব সুখ-দুঃখ ছিল, তার মধ্যে তারা ছিলেন আমার অনন্য সঙ্গী। তাদের সাহায্য ও ভালোবাসা আমাকে জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে শক্তি দিয়েছে। আমি আজও তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ এবং তাদের ঋণ কখনো শোধ হবে না।

আমি প্রার্থনা করি, আল্লাহ তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে ভালোবাসা, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে পূর্ণ করুন, তাদের সন্তানদের সুস্থ ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন, এবং আমাদের উম্মাহর সেবা করতে সাহায্য করুন। আল্লাহ তাদের দোয়াগুলো কবুল করুন এবং তাদের জীবনকে পরিপূর্ণ করুন।

শেষ কথা, জীবনের পথে আমরা সবাই একা নয়। ভালোবাসা ও সাহায্য আমাদের একত্রিত করে, আমাদের শক্তিশালী করে তোলে। আমি ধন্য যে আমার জীবনে এমন কিছু মানুষ ছিল যারা আমার পাশে ছিল, আমার জন্য দোয়া করেছে, আমাকে আশ্বাস দিয়েছে।

আল্লাহ যেন তাদের সব ভালো কাজের সওয়াব প্রচুর দান করেন। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি