মা কাকে বলে
মা কাকে বলে
মা – ভালোবাসা ও ত্যাগের প্রতিচ্ছবি
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা
আজকে আমি তোমাদের সামনে আমার মাকে নিয়ে কিছু কথা লিখব এবং তোমাদেরকে জানাবো—আমার জন্য আমার মা কতটুকু কষ্ট করেছে এবং কতটুকু বিসর্জন দিয়েছে।
আমার ছোট থেকে বড় হওয়ার পেছনে আমার আম্মুর অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল। আমার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আমার আম্মুই ছিল আমার বাবা এবং মা। একজন বাবা হীন সন্তানকে তার মা কতটুকু আদর, স্নেহ, মায়া-মমতা এবং ভালোবাসা দিয়ে বড় করতে পারে—তার জীবন্ত উদাহরণ আমার মা।
আমি জানি, শুধু আমার মা-ই নন, বরং প্রত্যেকটি মাই এমন উদার মনের মানুষ। প্রত্যেকটি মা তার সন্তানের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়। তাই আজ আমি আমার মায়ের এই ত্যাগের কাহিনী শেয়ার করব, যেন তোমরা বুঝতে পারো—মায়ের ভালোবাসার কোনো সীমা নেই।।
আমার মা, হাসিনা বেগম। ১৯৮৫ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। আমাদের পরিবারে ছিলেন দুই ভাই এবং তিন বোন। মা ছিলেন মাঝখানের সন্তান—সবার আগে বড় মামা, তারপর খালামণি, এরপর আমার মা।
যখন আমার মা প্রায় ৬ বছরের ছোট্ট মেয়ে, তখনই আমার নানা মারা যান। পরিবারের আকাশে নেমে আসে দুঃখের অন্ধকার। সংসারের খরচ চালানোর জন্য তেমন কেউ অবশিষ্ট রইল না। তবুও আমার বড় মামা, তখন বয়স মাত্র ১২ কিংবা ১৩ বছর, পরিবারের হাল ধরতে এগিয়ে এলেন।
নানু অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। মানুষের বাড়িতে গিয়ে কাজ করতেন, সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতেন, কষ্টের মাঝেই তাদের বড় করতেন। এভাবেই চলতে থাকে জীবনের সংগ্রামী পথচলা। আর এই কারণেই আমাদের পরিবারের কারও লেখাপড়ার সুযোগ তেমন করে হয়ে ওঠেনি। আমার ছোট মামা সর্বোচ্চ ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছিলেন।
একদিন মায়ের ফুপু তাকে বললেন— “তুমি আমার বাসায় থাকো, আমি তোমাকে নিজের মেয়ের মতোই রাখবো।” তখন মা ছোট্ট ছিলেন। ফুপু সত্যিই তাঁকে মেয়ের মতোই আগলে রাখলেন, শিক্ষা-দীক্ষা দিলেন, আদরে বড় করলেন। ফুপুর পরিবার ছিল ধনী, তাই মা সেখানে কষ্টের কিছুই অনুভব করেননি।
কিন্তু নানুর হৃদয় শান্তি পায়নি। একটি মা তো তার সন্তানের জন্য অশেষ মায়ার সাগর। সন্তানের থেকে দূরে থাকা তার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিল না। এভাবেই ধীরে ধীরে মা বড় হতে লাগলেন, আর সময়ের স্রোতে তাঁর জীবনে এল নতুন অধ্যায়।
যখন মায়ের বয়স প্রায় ১৫-১৬ বছর, তখনই তাঁর বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো। ছোটবেলায় মা ছিলেন দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ থানার সাতক্ষামার গ্রামের মেয়ে। কিন্তু পরবর্তীতে ঢাকায় চলে আসেন ছোটবেলাতেই, আর সেখান থেকেই তাঁর জীবনের নতুন কাহিনী শুরু হয়।
অর্থাৎ ওই সময় আমার আম্মু ঢাকায় ছিলেন। তবে শৈশব কেটেছে দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ থানার সাতক্ষামার গ্রামে। ছোটবেলাতেই তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ধীরে ধীরে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেন এবং জীবনের পথচলা শুরু হয় ঢাকাকে কেন্দ্র করেই।
যখন আমার আম্মুর বয়স প্রায় ১৫-১৬ বছর, তখন তাঁর জীবনের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়—আমার আব্বুর সাথে তাঁর বিবাহ। তবে এ বিয়ের ঘটনাটি ছিল একেবারেই বিশেষ। প্রথমে আমার আব্বু প্রস্তাব পাঠান আমার আম্মুর ফুপুর কাছে। এরপর আমার আম্মুর ফুপু যখন আমার আব্বুর চরিত্র, আচরণ এবং পারিবারিক অবস্থা দেখে সন্তুষ্ট হন, তখন এই পবিত্র সম্পর্কের জন্য রাজি হয়ে যান।
অবশেষে ২০০১ সালে আমার আব্বু ও আম্মুর বিয়ে সম্পন্ন হয়। আর এর এক বছর পরেই, ২০০২ সালে, আমি মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা ঢাকা আজিমপুর হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করি এবং আমার চোখ প্রথমবারের মতো এই পৃথিবীর আলো দেখে।
এভাবেই আমাদের সংসার সুখে চলছিল। কিন্তু ভাগ্যের লিখন কখনো এড়ানো যায় না। ২০০৬ সালে আমার আব্বু ইন্তেকাল করেন। সেদিন থেকেই আমার আম্মু একা হয়ে যান—বাবা ও মায়ের দায়িত্ব একাই নিতে হয় তাঁকে। আমার আম্মু তখন চিন্তায় পড়ে যান, কিভাবে আমাকে একা লালন পালন করবেন, কিভাবে আমার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবেন।
কিন্তু আল্লাহ তাআলা কখনো বান্দাকে একা ছেড়ে দেন না। বিভিন্ন মানুষের সহযোগিতায় আমাদের জীবন চলতে থাকে। তখন আমার ছোট মামা মুহাম্মদ হামিদুল ইসলাম আমাদের পাশে দাঁড়ান। তিনি সাতক্ষামার থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং ২০০৮ সাল পর্যন্ত আমাদের দেখাশোনা করেন। তাঁর সাহায্য ও ভালোবাসার কারণেই আমরা জীবনের কষ্টের দিনগুলো পার করতে পেরেছিলাম।
অর্থাৎ ওই সময় আমার আম্মু ঢাকায় ছিলেন। তবে শৈশব কেটেছে দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ থানার সাতক্ষামার গ্রামে। ছোটবেলাতেই তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ধীরে ধীরে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেন এবং জীবনের পথচলা শুরু হয় ঢাকাকে কেন্দ্র করেই।যখন আমার আম্মুর বয়স প্রায় ১৫-১৬ বছর, তখন তাঁর জীবনের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়—আমার আব্বুর সাথে তাঁর বিবাহ। তবে এ বিয়ের ঘটনাটি ছিল একেবারেই বিশেষ। প্রথমে আমার আব্বু প্রস্তাব পাঠান আমার আম্মুর ফুপুর কাছে। এরপর আমার আম্মুর ফুপু যখন আমার আব্বুর চরিত্র, আচরণ এবং পারিবারিক অবস্থা দেখে সন্তুষ্ট হন, তখন এই পবিত্র সম্পর্কের জন্য রাজি হয়ে যান।
অবশেষে ২০০১ সালে আমার আব্বু ও আম্মুর বিয়ে সম্পন্ন হয়। আর এর এক বছর পরেই, ২০০২ সালে, আমি মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা ঢাকা আজিমপুর হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করি এবং আমার চোখ প্রথমবারের মতো এই পৃথিবীর আলো দেখে।
এভাবেই আমাদের সংসার সুখে চলছিল। কিন্তু ভাগ্যের লিখন কখনো এড়ানো যায় না। ২০০৬ সালে আমার আব্বু ইন্তেকাল করেন। সেদিন থেকেই আমার আম্মু একা হয়ে যান—বাবা ও মায়ের দায়িত্ব একাই নিতে হয় তাঁকে। আমার আম্মু তখন চিন্তায় পড়ে যান, কিভাবে আমাকে একা লালন পালন করবেন, কিভাবে আমার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবেন।
কিন্তু আল্লাহ তাআলা কখনো বান্দাকে একা ছেড়ে দেন না। বিভিন্ন মানুষের সহযোগিতায় আমাদের জীবন চলতে থাকে। তখন আমার ছোট মামা মুহাম্মদ হামিদুল ইসলাম আমাদের পাশে দাঁড়ান। তিনি সাতক্ষামার থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং ২০০৮ সাল পর্যন্ত আমাদের দেখাশোনা করেন। তিনি আমার আব্বুর একটি কাজ দেখাশোনা করে কিছুটা আয় করতেন।
কিন্তু বাড়িতে নানু একা থাকায় মামা একপর্যায়ে আমাদের দুজনকে—আমি এবং আমার আম্মুকে—নিয়ে আবার সাতক্ষামারে চলে আসেন। ঢাকায় আমাদের যত জিনিসপত্র ছিল, বেশিরভাগই বিক্রি করতে হয়েছিল। অল্প কিছু জিনিস নিয়ে আমরা সাতক্ষামারে চলে আসি।
মামার কৃষিকাজের আয় দিয়ে আমাদের ভরণপোষণ এবং আমার পড়ালেখা চালানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিল। তবুও মামা হাল ছাড়েননি। আমি সেখানে গোলাপগঞ্জ ফুলকুঁড়ি কিন্ডারগার্টেন ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি হই। এভাবে কষ্টের মাঝেই দিন চলতে থাকে।
পড়ালেখায় আমি শুরু থেকেই ভালো করতাম। শিক্ষকরা আমাকে ভালো ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেন। কিন্তু প্রতিদিনের পথ ছিল কষ্টের—স্কুল ছিল অনেক দূরে, গাড়ি ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে হতো। তবুও আমার মা ও মামা চেষ্টা করতেন যাতে আমার স্বপ্ন থেমে না যায়।
এরপর আমার আম্মুর আরেক ফুপু আমাদের খবর নেন। সবকিছু শোনার পর তিনি আমার আম্মুকে প্রস্তাব দেন—“তুমি আমার বাড়িতে চলে এসো।” তখন আমার আম্মু তাঁর কাছে চলে যান, সেই বাড়ি ছিল ঠাকুরগাঁওয়ে। সেখানে গিয়ে আমার আম্মু তাঁর ফুপুর কাজকর্মে সহযোগিতা করতে থাকেন।
কিন্তু মায়ের মন সন্তানের জন্য অস্থির থাকবেই। আমাকে ছাড়া তিনি এক মুহূর্তও থাকতে পারতেন না। তাই একদিন তিনি নানুকে বললেন—“পারভেজকে ছাড়া আমার আর ভালো লাগছে না, আমি ওকে এখানে নিয়ে আসতে চাই।” তখন তাঁর ফুপু আনন্দের সাথে রাজি হয়ে গেলেন এবং বললেন—“অবশ্যই ওকে নিয়ে এসো, এখানেই ভর্তি হবে এবং এখানেই পড়াশোনা করবে।”
তো কথামতো আমার আম্মু আমাকে নিতে এলেন এবং আমি মামাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কাপড়চোপড় গুছিয়ে নিয়ে আম্মুর সাথে রওনা হয়ে ঠাকুরগাঁও পৌঁছালাম। সেখানে গিয়ে আমি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হলাম। ধীরে ধীরে দিনগুলো স্বাভাবিকভাবে কেটে যাচ্ছিল।কিন্তু আমার আম্মু সেখানে কোনো আরামের জীবন কাটাচ্ছিলেন না। কারণ আমার পড়াশোনা, থাকা-খাওয়া—সবকিছুই তাঁর নিজের পরিশ্রমে চলত। অর্থাৎ আমার আম্মু বাড়ির সমস্ত কাজকর্ম করতেন—কাপড় ধোয়া, রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার—সবকিছু। আর সেই কাজের বিনিময়েই আমার পড়াশোনা চালাতেন।
এই কঠোর পরিশ্রমে আম্মুর শরীরে নানা রকম অসুস্থতা দেখা দিতে শুরু করল। কখনো শরীর ভীষণ ব্যথা করত, কখনো আবার অসহ্য ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তেন। আমি ছোট্ট একটা ছেলে, কিন্তু মায়ের কষ্ট আমার হৃদয়কে যেন ছিঁড়ে ফেলত। অসহায়ভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম—কীভাবে আমার মা আমাকে বড় করতে গিয়ে নিজের জীবনকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করছেন।
এমনকি মাঝে মাঝে আমার আম্মুকে কাজের জন্য বকাঝকাও শুনতে হতো। এসব দেখে আমার সহ্য হতো না। তখনও আমি নাবালেগ ছিলাম, তবুও মন শক্ত করে একদিন আমার মামাদের বললাম: “আম্মু এভাবে কষ্ট করতে করতে একদিন ভেঙে পড়বে। তোমরা দ্রুত আম্মুর বিয়ের ব্যবস্থা করো।”
আমি তখনো ছোট ছিলাম, কিন্তু আল্লাহ আমার অন্তরে সেই বোধ জাগিয়ে দিয়েছিলেন যে একজন স্বামীহারা নারীর নতুন সংসার গড়া শরীয়তে বৈধ এবং প্রয়োজনীয়। আমার কথায় মামারা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিলেন এবং পাত্র খোঁজা শুরু করলেন।
অবশেষে আমার আম্মুর বিয়ে হয় আমার ওবায়দুল মামার বন্ধুর সাথে। এই বিয়েতে বড় একটি অংশের খরচ বহন করেছিলেন আমার প্রিয় হামিদুল মামা। এভাবেই প্রায় ৯ বছর পর আমার আম্মুর জীবনে নতুন আলো জ্বলে ওঠে।
আজ আমার আম্মু আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো আছেন। স্বাভাবিক সংসার জীবন যাপন করছেন। আর অতীতের মতো একা পরিশ্রম করতে হয় না, অন্য কারো বকাও শুনতে হয় না। এখন তিনি ইচ্ছেমতো সব করতে পারেন।
কিন্তু আমার হৃদয়ে একটাই অনুভূতি সবচেয়ে গভীরভাবে রয়ে গেছে—আমার মা আমার জন্য যা কিছু করেছেন, যে পরিমাণ কষ্ট সহ্য করেছেন, সেটা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আমার মা আমার জন্য যে শ্রম দিয়েছেন, যে ঘাম ঝরিয়েছেন, তার তুলনা পৃথিবীর আর কিছু দিয়ে হয় না।
আমি কখনো পারব না আমার আম্মুকে ফেলে দিতে। যদি আমার আম্মু চাইতেন, তাহলে তো আমাকে হোটেলে কাজে লাগিয়ে দিতেন, অথবা বিভিন্ন কষ্টকর কাজের মধ্যে ঠেলে দিতেন। কিন্তু আমার আম্মু তা করেননি। তিনি চেয়েছিলেন—“আমার ছেলেকে আমি বড় করব, তাকে শিক্ষিত করব, কোনভাবেই তাকে নষ্ট হতে দেব না।”তাই আমার আম্মু নিজের জীবনকে কষ্টের অন্ধকারে ঢেকে আমাকে সুখের আলোয় রাখতে বেছে নিলেন ত্যাগের পথ। নিজের আরামকে বিসর্জন দিয়ে, নিজের স্বপ্নকে পেছনে ফেলে কেবল আমার জন্য যুদ্ধ করলেন।
আলহামদুলিল্লাহ! অবশেষে আল্লাহ তাআলা আমার আম্মুর জীবনে একজন উত্তম স্বামী দিয়েছেন, আর আজ তিনি সংসারে সুখে আছেন। আর আমি? আমি ধাপে ধাপে পড়াশোনা শেষ করেছি। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে মক্তব, নাযেরা, হিফজখানা এবং এখন কিতাবখানা—সবই পেরিয়ে এসেছি আমার মায়ের অবদানের কারণেই।
আজ আমি একজন হাফেজ। যদি আমার আম্মু অন্যের বাড়িতে গিয়ে কাজ না করতেন, নিজের ঘাম না ঝরাতেন, নিজের শরীরকে কষ্টে না ফেলতেন, তাহলে হয়তো আজ আমি এই অবস্থানে পৌঁছাতে পারতাম না।
পৃথিবীর প্রতিটি মা-ই তাঁর সন্তানের জন্য এমন ত্যাগ স্বীকার করেন। তাঁরা নিজেদের জীবনকে বিলীন করে দেন কেবল সন্তানকে গড়ে তোলার জন্য। কিন্তু হায়! সন্তানরা কখনো সেই মায়ের প্রকৃত মূল্য দিতে পারে না। আমরা প্রায়শই মায়ের পাশে বসে একটু সময় দিতে পারি না, তাঁকে সান্ত্বনা দিতে পারি না, তাঁর ক্লান্ত হাতের ওপর আমাদের স্নেহময় হাত রাখি না।
সত্যিই, আমরা বড়ই হতভাগা সন্তান… অথচ মা, তুমি সেই অমূল্য সম্পদ, যাকে কোনো কিছুর সাথেই তুলনা করা যায় না। তোমার ত্যাগের কাছে পৃথিবীর সব সম্মানও যথেষ্ট নয়।
আমরা আমাদের মায়ের কোলে, তাঁর পিঠে ভর করেই বড় হয়েছি। আমাদের প্রতিটি হাসি, প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে লুকিয়ে আছে মায়ের ত্যাগের অশ্রু। আমরা মাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, অথচ সেই মা বিন্দুমাত্র অভিযোগ না করে সব কষ্ট সয়ে গেছেন, শুধু আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।চিন্তা করো—আজ যদি আমার বয়স হয় ২০ বছর, তবে প্রায় ১৫ বছর আগে আমি কেমন ছিলাম? জন্মের পর আমি ছিলাম এক অসহায় শিশু, কিছুই করতে জানতাম না। কিন্তু কে আমাকে এত বড় করলো? কে আমাকে খাওয়ালো, হাঁটতে শিখালো, পড়ালেখার পথ দেখালো? উত্তর একটাই—আমার মা!
আজ তুমি হয়তো একজন বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী কিংবা শিল্পপতি হয়েছো। কিন্তু জানো কি? তোমার এই সাফল্যের নেপথ্যে যিনি নিরলস পরিশ্রম করেছেন, তিনিই তোমার মা। তুমি হয়তো পড়ালেখা করেছো, কিন্তু তোমার মা চোখের পানি ফেলে দোয়া করেছেন তোমার জন্য।
তুমি আজ একজন বড় আলেম, একজন হাফেজ সাহেব হয়েছো। কিন্তু জানো এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান কার? তোমার মায়ের! তোমার মা মানুষের বাসায় কাজ করে, বকা শুনে, অশ্রু লুকিয়ে সহ্য করে তোমাকে গড়ে তুলেছেন। তিনি নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে তোমাকে শিক্ষিত করেছেন, তোমাকে আল্লাহর পথে দাঁড় করিয়েছেন।
অথচ আজ আমরা হতভাগা সন্তানরা কি আমাদের মায়ের প্রাপ্য ভালোবাসা দিতে পেরেছি? আমরা কি তাঁর স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরেছি? আমরা কি এক মুহূর্ত তাঁর কোলে মাথা রেখে বলেছি— “মা, তোমার ত্যাগের ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারবো না।”
তাই আমাদের প্রত্যেকটি সন্তানের কর্তব্য হলো—আমরা যেন মায়ের জন্য দোয়া করি, মায়ের জন্য কাঁদি, মায়ের জন্য আল্লাহর কাছে হাত তুলি। আমাদের মুখে সবসময় এই দোয়া থাকা উচিত: رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا অর্থাৎ: “হে আমার রব! তাদের প্রতি রহম করো, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন পালন করেছেন।”
আমি আমার মায়ের খেদমত করবো, বারবার করবো। আমার আম্মুর কী প্রয়োজন তা আমি জিজ্ঞেস করে করে জানবো, তাঁর প্রতিটি প্রয়োজন পূরণে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।আমার আম্মু আমার জন্য কত কিছু করেছেন—আমার কাপড় ধুয়েছেন, আমার জন্য ভালোবাসা দিয়ে খাবার রান্না করেছেন, আমি যে পাত্রে খেয়েছি সেই পাত্র নিজ হাতে পরিষ্কার করেছেন। তাহলে কি আমি পারি না আজ আমার মায়ের জন্য কিছু করতে?
আমি কি পারি না সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই আমার নিজের বিছানা গুছাতে? আমি কি পারি না কাঁথা ভাঁজ করে রাখতে? আমি কি পারি না মায়ের ঘর ঝাড়ু দিতে? আমি তো তাঁর সন্তান, আর মায়ের প্রতিটি কাজই আমার কাছে নিজের কাজের মতো প্রিয় হওয়া উচিত।
আমার মা হয়তো আমাকে কখনো কাজ করতে বলবেন না, কিন্তু আমাকে নিজে থেকেই তাঁর জন্য কাজ করতে হবে। আমি নিজেই মায়ের কাছে গিয়ে বলতে চাই— “আম্মু, আজ আমি তোমার কাপড় ধুয়ে দেবো, আজ আমি তোমার বাসন মাজবো, আজ আমি তোমার ঘর পরিষ্কার করবো।” কারণ মায়ের খেদমত শুধু দায়িত্ব নয়; এটি আমার ইবাদত, আমার জান্নাতের পথ।
আমি তোমার রান্নার কাজে সহযোগিতা করব। তাহলে দেখবে মায়ের মন কত আনন্দের হয়, কত সুখের হয় এবং কতটুকু দোয়া তোমার জন্য করে। দেখবে, সঙ্গে সঙ্গে চোখের পানি ফেলে দিবে এবং তোমার জন্য আল্লাহর দরবারে দু হাত তুলে দোয়া করবে— মন খুলে, মনে প্রাণে দোয়া করবে। আর এই দোয়াটাই হবে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় পুঁজি, যা তোমার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়কেই আলোকিত করবে।বিয়ের পর সন্তান তার মাকে ভুলে যাবে— এমনটি করা যাবে না। বরং আমার স্ত্রীর হক এবং আমার মায়ের হক— দুটোই পূর্ণাঙ্গভাবে আমাকে আদায় করতে হবে। স্ত্রীর হক আদায় করতে গিয়ে যদি মাকে কষ্ট দেওয়া হয়, তবে সেটা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং দুজনকেই ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিতে হবে, দুজনের মধ্যেই এমন এক বন্ধন সৃষ্টি করতে হবে যাতে একজন আরেকজনকে দেখে চোখের শীতলতা অনুভব করে এবং হৃদয়ে প্রশান্তি পায়।
আমার মা বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছেন। তাকে সেবা করা আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। মাকে সেবা করার জন্য আমার যত টাকা খরচ করা প্রয়োজন, আমাকে সাধ্যমতো ততটুকুই খরচ করতে হবে। এরপরেও আমার মায়ের খেদমত করা আমার কর্তব্য। আমি অন্য কারও অপেক্ষায় থাকব না। বরং আমি নিজেই আমার মায়ের পেশাব-পায়খানা পরিষ্কার করব, সময়মতো ওষুধ সেবন করাব, তার কাপড়-চোপড় ধুব— কারণ আমি সন্তান, আমার মায়ের খেদমত অন্য কেউ কেন করবে?
কেউ হয়তো বলতে পারে, “আমার সময় হয় না।” কিন্তু ভাবো তো, সারাদিনের ২৪ ঘণ্টায় কি আমি এক মুহূর্তও বের করতে পারি না আমার মায়ের খেদমতের জন্য? ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়। আসলে আমরা ইচ্ছা করতেই জানি না, যার কারণে আমরা মায়ের খেদমত করতে পারি না। অথচ একটুখানি ইচ্ছাই পারে আমাদের মায়ের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দিতে।
সবচেয়ে বড় খেদমত হলো, আমার আম্মু যদি কুরআন পড়তে না পারেন, আমার আম্মু যদি নামাজ পড়তে না পারেন, তাহলে তাকে এগুলো শিখিয়ে দেওয়া। তাকে ধীরে ধীরে ধর্মীয় বিষয়গুলো বোঝানো, উচ্চারণ করে করে তাকে কুরআন পড়িয়ে দেওয়া— এটাই হবে একজন সন্তানের পক্ষ থেকে তার মায়ের সবচেয়ে বড় খেদমত।যে সন্তান তার মাকে কুরআন শিখিয়ে দেয়, যে সন্তান তার মাকে আল্লাহর ভয় শেখায় এবং মায়ের অন্তরকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কযুক্ত করে দেয়— সেই সন্তানই হলো প্রকৃত সফল সন্তান। আর সেই মা-ই হবেন প্রকৃত সফল মা, যার সন্তান তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তির পথ দেখিয়েছে।
আল্লাহ আমাদের প্রত্যেকটা কথাকে আমল করার তৌফিক দান করুন। তিনি যেন আমাদের অন্তরে মায়ের ভালোবাসা ও মমতা ধারণ করার তৌফিক দান করেন এবং মায়ের খেদমতের মাধ্যমে আমাদের জান্নাতের দরজা খুলে দেন। আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।
Comments
Post a Comment