আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও আমাদের অধঃপতন

 আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও আমাদের অধঃপতন

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 

আলহামদুলিল্লাহ! প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমাদেরকে দয়া ও মায়া করে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। তিনি যদি আমাদের প্রতি রহম না করতেন, তাহলে আমরা কীভাবে এই দুনিয়াতে চলাফেরা করতাম?

আজ তিনি আমাদেরকে খাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন, বিধায় আমরা খেতে পারি। তিনি আমাদেরকে চলার শক্তি দিয়েছেন, বিধায় আমরা চলতে পারি। তিনি আমাদের কথা বলার শক্তি দিয়েছেন, বিধায় আমরা কথা বলতে পারি।

একটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার, যে আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করেছেন—আমি যদি সেই আল্লাহকে ভুলে যাই, তাহলে আমি দুনিয়াতে কিভাবে চলব? কারণ আল্লাহ যদি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে দুনিয়ার সবকিছুই আমার শত্রু হয়ে যাবে এবং বিপদ-আপদ আমার দিকে ধেয়ে আসতে থাকবে।

দেখো, কত পরিবার আছে যারা ক্ষুধার জ্বালায় না খেয়ে মারা যায়, যাদের রুজিতে বরকত নেই, যাদের পরিবারে সুখ-শান্তি নেই—বউ স্বামীর কথা শোনে না, ছেলে বাবার কথা শোনে না। বাসায় সবসময় ঝগড়া লেগেই থাকে। কেন এমন হয়?

এর একটাই কারণ—আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টি। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, অথচ আমরা তাঁর বিধান মানি না। তিনি আমাদের নামাজ পড়ার আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু আমরা পড়ি না। রমজানে রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু আমরা রাখি না।

তিনি আমাদের ভালো ব্যবহার করতে বলেছেন, কিন্তু আমরা গীবত করি, অন্যের দোষ খুঁজি, ঝগড়া করি, ফাসাদ লাগাই। আমরা পরিবারের দায়িত্ব নিই না, স্ত্রী বেপর্দা হয়ে চলে, ছেলে-মেয়েরা খারাপ বন্ধুদের সাথে মিশে যায়—কিন্তু আমরা খেয়াল করি না।

আমাদের এই অধঃপতনের কারণ—আল্লাহর বিধান না মানা। আমরা যেভাবে চলতে বলা হয়েছে, সেভাবে চলি না; যেভাবে আমল করতে বলা হয়েছে, সেভাবে করি না। ফলে কোনো কাজে বরকত হয় না।

জুমার নামাজ—কতবার আমরা ছেড়ে দেই? অথচ হাদীসে কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে যারা জুমার নামাজ ফেলে দেয়।

আমরা একটু ভেবে দেখি—আমি যেই পথে হাঁটছি, তা কি ঠিক? আমি কি আমার মাওলাকে অসন্তুষ্ট করে দিন কাটাচ্ছি? আমি কি বুঝি না যে একদিন আমারও মৃত্যু হবে? আমার বাবা-দাদা আজ কোথায়? তারাও তো কবরের জগতে। আমাকেও একদিন চলে যেতে হবে।

আমি কি আল্লাহর দরবারে জবাব দিতে পারব? আমি কি জাহান্নামের আজাব সহ্য করতে পারব? আমরা ভুলে যাই মৃত্যুর কথা, ভুলে যাই কবরের কথা। অথচ মৃত্যুর কথা স্মরণ থাকলে প্রতিটি মুহূর্ত নেক আমলে কাটত।

আমি কি পরিবারের সাথে ভালো আচরণ করি? মানুষকে আমার উপর খুশি আছে নাকি আমার উপর অসন্তুষ্টি হয়ে আছে। আমার সন্তান কি আমার উপর খুশি আছে? আমার বিবি কি আমার উপর খুশি আছে। অবশ্যই আমাকে আমার পরিবারের সাথে ভালো আচরণ করতে হবে। আমাকে তাদের সাথে পরামর্শ করতে হবে পারিবারিক বিষয়ে। কখনো ঝগড়া করা যাবে না নিজ বিবির সাথে। ওই পুরুষ বড়ই কাপুরুষ যে নাকি তার সন্তানকে এবং তার বিবিকে ভালো আচরণ দেখায় না বরং সব সময় রুঢ় ব্যবহার করে। ভদ্র আচরণ করে না , নম্রভাবে কথা বলে না। আদর্শ স্বামী কে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এক আদর্শ স্বামী। আম্মাজান সবাই ছিলেন উনার উপর সন্তুষ্ট। কারণ তিনি কখনো কোন আম্মাজানকে কষ্ট দেননি। সব সময় তাদের সাথে ভালো আচরণ করেছেন। আম্মাজানদের কখন কি প্রয়োজন তিনি তা পুরা করেছেন। আম্মাজানদের সাথে রসিকতা করেছেন। আমার পরিবার আমার হাতে। আমি যদি আমার পরিবারকে খুশি রাখতে চাই এবং সব সময় সুখময় পরিবার হিসেবে ঘরে রাখতে চাই তাহলে আমাকে অনেক অবদান রাখতে হবে। একটু খাবার ব্যতিক্রম হইলেই মেজাজ গরম হয়ে যাওয়া, স্ত্রীর সাথে কোন না কোন কারণে ঝগড়া লাগিয়ে দেওয়া, কাপড়টা এখন ধোয়া হয়নি যার কারণে বাড়িতে তোলপাড় করা, এখন অভাবের সংসার যাচ্ছে তো স্ত্রীর উপর স্টিমরোলার চালানো, বরং আমাকে তো সব সময় ধৈর্য ধারণ করে থাকতে হবে, এবং শোকরের হালাতে চলতে হবে। তাই আমি সর্বদা চেষ্টা করব যাতে আমি অন্যদের চোখের শীতলতা হতে পারি। আমার দ্বারা যেন অন্যরা কোন কষ্ট না পায়। আমার উপর যেন সবাই সন্তুষ্ট থাকে। আমার জন্য যেন সবাই দোয়া করে। দুইটা চোখ বন্ধ করলেই এবং একটু চিন্তা করলে বুঝতে পারবো যে সমাজের মানুষ কি আমাকে মহব্বত করে কি করে না।। যদি এরকম হয় যে, অন্যান্য ব্যক্তিরা আমাকে মুহাব্বত করে না । আমাকে ভালোবাসে না। তাহলে বুঝতে হবে আমার কোন না কোন সমস্যা হচ্ছে।।

আসলে এই দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কেন পাঠিয়েছেন একমাত্র তার ইবাদত করার জন্যই।তার গোলামী করার জন্যই। এই দুনিয়া রং তামাশা এবং মেতে উঠার জন্য নয়। এই দুনিয়াতে আমি যা ইচ্ছা তাই করবো এজন্য নয়। এই দুনিয়াতে এসে আমার মন চায় জিন্দেগী এবং যখন যা মনে চায়, সেটাই করব এটাও নয়। বরং আল্লাহ এই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন একমাত্র জান্নাত কামাই করার জন্য। তার সন্তুষ্টি কামাই করার জন্য।। কিন্তু দুনিয়ার এই রং চাকচিক্য আমাকে এমন ভাবে ব্যস্ত করে রেখেছে যে, আমি আমার মাওলাকে ভুলে গিয়েছি। কত নিয়ামত দ্বারা তিনি আমাকে বেষ্টন করে রেখেছিলেন, তিনি আমার শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিকঠাক রেখেছেন। দুইটা চোখ, দুইটা কান, দুইটা হাত, দুইটা পা, সহ যখন যেই অঙ্গ যেভাবে দেয়া দরকার সেটাকেই তিনি দিয়েছেন। এমনকি তিনি আমাকে বলার শক্তি, শ্রবণ করার শক্তি, দেখার শক্তি, পাশাপাশি ঘ্রাণ নেওয়ার শক্তি, খাবার শক্তি, পর্যাপ্ত দিয়েছেন। আচ্ছা বলতো বাবা,, এগুলো কি আমি চেয়েছি আল্লাহর কাছে। তিনি কি চাইলে পারতেন না,আমাকে একটা হাত না দিতে এবং একটা পা না দিতে। তিনি কিন্তু চাইলেই পারতেন আমাকে বোবা বানাতে। আমাকে বধির বানাতে। তিনি চাইলেই কিন্তু পারতেন, আমাকে অন্ধ বানাতে। কিন্তু তিনি তো আমাকে অনেক মহব্বত করেন,ভালোবাসেন। এইজন্যই তো তিনি আমাকে এত সুখ শান্তি দিয়েছেন। যদি আমাকে তিনি অন্ধ, বধির,বোবা বানাতেন, তাহলে কি দুনিয়ার কোন চাকচিক্যে আমার এই সমস্যাকে দূর করত। সারাটা জিন্দেগী আমাকে পঙ্গু হয়েই থাকতে হতো। সুতরাং তুমি নিজেই সিদ্ধান্ত নাও এখন তুমি কি করবে। শুধুমাত্র তাকেই ভালোবাসবে নাকি দুনিয়ার এই চাকচিক্যময় রঙ দেখে তাকে ভালবাসবে। একসময় কিন্তু দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে। দেখো আশেপাশে,চেয়ে দেখো, যারা একসময় ছিল, তারা আজ নেই। আজকে তারা মাটির নিচে শুয়ে আছে তারাও একসময় দুনিয়াতে অনেক কিছু চাইতো এই দুনিয়ার লোভে তারাও নিজেদের জীবনকে শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু আজকে তারা মাটির নিচে শুয়ে আছে, মাটি তাদেরকে খেয়ে ফেলেছে। সুতরাং হে বোন, তোমাকে খুব সতর্ক হয়ে চলতে হয়। আল্লাহ অসন্তুষ্ট হয় এমন কোন কাজ করা যাবে না। তোমাকে খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে আল্লাহর অসন্তুষ্ট হন কোন কোন কাজে। এগুলো থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে। নিয়ত করি,,,,ইনশাআল্লাহ আজ থেকে আমি সবসময় পর্দা করব,প্রতিনিয়ত কিছু কিছু কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করব, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করব সময়মতো, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করব, বেগানা মহিলাদের সাথে অথবা মেয়ে বন্ধু থেকে বেঁচে থাকবো এবং তাদের সাথে কথা বলবো না, যেকোনো ধরনের রিলেশনশিপ থেকে বেঁচে থাকবো । রমজান মাসের প্রতিটি রোজা আদায় করব। কখনো কোনো নাফরমানী মূলক কাজ করবো না। গভীর রাতে তাহাজ্জুদ পড়ার চেষ্টা করব। বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করব। জিকির করবো বেশি বেশি। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং বেশি বেশি দরুদ শরীফ পাঠ করব। চোখের গুনাহ কানের গুনাহ, মুখের গুনাহ হাতের গুনাহ পায়ের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করব। কখনো গীবত শুনব না এবং অন্যের দোষ ত্রুটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করবো না। নিজেও কখনো গীবত গাইবো না। কখনো কোনো মানুষকে কষ্ট দিব না। বেয়াদবি মূলক আচরণ বড়দের সাথে করবো না এবং ছোটদের সাথেও করবো না। আমি বড়দেরকে সম্মান করবো, মা বাবার খেদমত করবো। আমার মা বাবা যাতে কোনভাবেই আমার উপর অসন্তুষ্ট না হন সেদিকে খেয়াল রাখবো, কিছু কিছু সময়ে মা বাবার সাথে কাটাবো। সব সময় তাদের কাজে সহযোগিতা করব। এটা আল্লাহ খুশি হবেন। আল্লাহই তো সব করেন তাই না, এমন কোন কাজ করবে না যাতে তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে যান। বাবার খেদমত করবে, বাবার সাথে সময় দিবে, কখনো তার সাথে খারাপ আচরণ করবে না। 

কখনো চোখের গুনাহ কানের গুনাহ করা যাবে না।

তাই আমাদের উচিত বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করা। কবরের হিসাব সহজ হবে না। যদি আমি সেই হিসাব দিতে না পারি, তবে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি আমাকে সহ্য করতে হবে। আমি কি পারব?

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি