রাস্তায় চলাফেরার আদব ও সচেতনতা
রাস্তায় চলাফেরার আদব ও সচেতনতা
আলহামদুলিল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা সেই মহান প্রভুর জন্য, যিনি আমাদেরকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, আমাদের জীবনযাত্রাকে করেছেন বিধিবদ্ধ, এবং সমাজে চলার জন্য দিয়েছেন সুস্পষ্ট আদর্শ। মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামের রয়েছে অমোঘ দিকনির্দেশনা—তার ব্যতিক্রম নয় আমাদের রাস্তাঘাটে চলাফেরার বিষয়ও।
আমরা প্রতিদিন নানান কারণে বাইরে বের হই, বাজারে যাই, কাজের সন্ধানে চলি, মসজিদে যাই, মাদরাসায় যাই—এসবকিছুতেই রাস্তাঘাট ব্যবহার করি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে আমাদের অনেকের আচরণ, পোশাক, চোখ, বাক্য ও আচার-আচরণে দেখা যায় চরম অবহেলা ও গাফিলতি। ফলে ব্যক্তি জীবনে নেমে আসে বিপদ, সমাজে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা, এবং দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে পড়তে হয় মহাবিপদের সম্মুখীন।
রাস্তা শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি সামাজিক মঞ্চ, যেখানে ব্যক্তির চরিত্র, নৈতিকতা ও দীনদারির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। রাস্তা ব্যবহারে আদব রক্ষা করা না হলে ঈমান হুমকির মুখে পড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়া ইমানের একটি শাখা।”
(সহীহ মুসলিম)
- পর্দা রক্ষা করে চলা – নারীদের ক্ষেত্রে পর্দা অপরিহার্য, আর পুরুষদের জন্য চোখ হেফাজত করা ফরয।
- প্রয়োজনে বের হওয়া – অপ্রয়োজনীয়ভাবে রাস্তায় ঘোরাফেরা এড়ানো।
- ভদ্রতা ও নম্রতা বজায় রাখা – কাউকে কষ্ট না দিয়ে চলা, কথা বলার ক্ষেত্রে মার্জিত ভাষা ব্যবহার করা।
- পথচারীদের অসুবিধা না করা – দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে না থাকা, রাস্তার মাঝখানে আলাপচারিতা না করা।
- তাফাক্কুর করা – চলতে চলতে আকাশ, গাছ, পথের নানা চিহ্নে আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে ভাবা।
- অশ্লীল পোশাক পরা বা প্রদর্শনমূলক পোশাক পরে বের হওয়া।
- বেখেয়াল দৃষ্টিতে তাকানো, নারী-পুরুষের অবৈধ দৃষ্টি বিনিময়।
- উচ্চস্বরে কথা বলা, অপ্রাসঙ্গিক হাসি-তামাশা করা।
- ফোনে উচ্চস্বরে কথা বলা এবং গীবত ও লঘু বিষয় আলোচনা করা।
- নোংরা ফেলা বা রাস্তা অপরিষ্কার রাখা।
আজ রাস্তায় চলতে গিয়ে চোখে পড়ে চরম অব্যবস্থা—বেপর্দা নারীদের আনাগোনা, বেকার যুবকদের টিকটক-ঘোরাফেরা, অশ্লীল কথাবার্তা, এবং মসজিদের আশপাশে এমন চিত্র, যা আমাদের ইমান কাঁপিয়ে তোলে। অথচ রাস্তা শুধু দুনিয়ার নয়, আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের একটি মাধ্যমও হতে পারে, যদি আদব বজায় রাখা হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের রাস্তার ব্যবহার সম্পর্কে বলেছিলেন: “তোমরা যদি রাস্তায় বসতেই চাও, তবে তার হক দাও।”
সাহাবীরা বললেন, “রাস্তার হক কী?” তিনি বললেন, “চোখ নামিয়ে রাখা, কষ্টদায়ক বস্তু সরানো, সালামের জবাব দেয়া, ভালোর আদেশ দেয়া ও মন্দ থেকে নিষেধ করা।”
আমাদের উচিত নিজেদের, পরিবারকে এবং বিশেষ করে সন্তানদের শৈশব থেকেই রাস্তার আদব শেখানো, যাতে তারা এই সমাজে একদম আলাদা পরিচয়ের মানুষ হয়ে উঠতে পারে। আমরা যদি নিজেদের সংশোধন করি, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, এবং রাস্তা হবে নিরাপদ, পবিত্র ও বরকতময়।
হে প্রিয় ভাই ও বোনেরা! আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর নির্দেশনা মোতাবেক কাটানো ফরয। রাস্তা কোনো আলাদা জায়গা নয়—সেখানে আল্লাহ আছেন, ফিরিশতা আছেন, এবং মৃত্যু এক সেকেন্ড পরেও আসতে পারে। তাই আসুন, আমরা নিজেরা সচেতন হই, সমাজকে সচেতন করি এবং রাস্তা নামক এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটিকে বানিয়ে তুলি আমাদের ঈমান ও আমলের মাঠ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই বিষয়ে সচেতনতা ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
Comments
Post a Comment