রাস্তায় চলাফেরার আদব ও করণীয়

 রাস্তায় চলাফেরার আদব ও করণীয়

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা

রাস্তাঘাট—এই শব্দটি আজ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবনের প্রতিটি ধাপে, প্রতিটি যাত্রায়, প্রতিটি গন্তব্যে আমাদের পথচলা শুরু হয় এই রাস্তাঘাট দিয়ে। কিন্তু সেই চলার পথ যেন নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উপযোগী হয়—এটাই একজন মু’মিনের মূল চাওয়া।

অনেক সময় আমাদের অবহেলার কারণেই রাস্তাঘাট আমাদের জন্য বিপদের জায়গায় পরিণত হয়। হাঁটতে গিয়ে দুর্ঘটনা, কথা বলতে গিয়ে গিবত, তাকাতে গিয়ে গুনাহ—সব কিছু একত্রিত হয় একটিমাত্র অসতর্কতার কারণে। তাই ইসলামের আলোকে, রাসূল (সা.)-এর বর্ণিত হাদীসের আলোকে, রাস্তায় চলাফেরা করার আদবগুলো জানা ও মানা অপরিহার্য।

রাস্তার ব্যবহার: একটি সময়োপযোগী প্রয়োজন

বর্তমান যুগে আমরা কেউই রাস্তা ব্যবহার ছাড়া চলতে পারি না। মাদরাসা হোক বা স্কুল, বাজার হোক বা অফিস—সবখানেই পৌঁছাতে হলে রাস্তাঘাটই ভরসা। কিন্তু আমরা কি কখনো চিন্তা করেছি, রাস্তা ব্যবহার করা মাত্রই একটি দায়িত্বও আমাদের ওপর বর্তায়?

রাস্তা হলো মানুষের চলাফেরার স্থান। এখানে রয়েছে পর্দা রক্ষার তাগিদ, শিষ্টাচার রক্ষার আদব, পথচারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নীতিমালা। এসব বিষয়কে অবজ্ঞা করা মানে একদিকে যেমন নিজের জান-মালের ঝুঁকি, অন্যদিকে দীনী গুনাহের সমুদ্রে পতন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ কী বলেছেন?

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«إياكم والجلوس في الطرقات»
তোমরা রাস্তায় বসে থাকা থেকে বিরত থাকো।

সহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের জন্য তো সেখানে বসা জরুরি হয়ে পড়ে। তখন তিনি বললেন:
«فإذا أبيتم إلا المجالس فأعطوا الطريق حقه»
যদি বসতেই চাও, তাহলে রাস্তার হক আদায় করো।

রাস্তার হক কী? রাসূল ﷺ ব্যাখ্যা করেছেন: দৃষ্টি অবনমিত রাখা, কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে ফেলা, সালাম দেয়া, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

আধুনিক রাস্তায় মুসলমানের করণীয়

বর্তমানে রাস্তার অবস্থা খুবই ভয়ংকর। নারীরা পর্দা না করে প্রকাশ্যে, তরুণরা গান শুনতে শুনতে, কেউ কেউ খারাপ পোশাকে চলাফেরা করছে। এমন এক পরিবেশে নিজেকে ঈমানের উপর স্থির রাখা কঠিন। সুতরাং:

  • দৃষ্টি সংযত রাখো
  • জরুরি ছাড়া বাইরে বের না হওয়া
  • পোশাক শালীন রাখা
  • আবশ্যক না হলে কারো সাথে বেশি কথা না বলা
  • মসজিদে যাতায়াতে রাস্তার ফজিলত মনে রাখা

সতর্কতা ও পরিণতি

একটি ভুল তাকানো—চোখের গুনাহ। একটি ভুল কথা—পরনিন্দা। একটি খারাপ মনোভাব—আহংকার। রাস্তায় চলতে চলতে এই সমস্ত গুনাহে লিপ্ত হওয়া খুবই সহজ, যদি আল্লাহভীতি না থাকে। তাই প্রত্যেক মু’মিনের উচিত প্রতিটি পদক্ষেপে তাকওয়া অবলম্বন করা।

পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব

আজকের যুব সমাজ রাস্তার পরিবেশে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুর মতো সম্পর্ক রাখা এবং তাদের চলাফেরার ধরন নজরদারিতে রাখা। রাস্তার আদব শেখানো যেমন আবশ্যক, তেমনি রাস্তা যেন ফিতনার স্থানে পরিণত না হয়—তাও নিশ্চিত করতে হবে।

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ

যখন তুমি ঘর থেকে বের হও, মনে করো: আল্লাহ আমাকে দেখছেন। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মনে রেখো: আমি একজন দীনদার মুসলমান, রাসূলের উম্মত। আমি এমন কিছু করবো না, যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন।

শেষ কথা

রাস্তা শুধুই চলার জায়গা নয়, এটি হতে পারে জান্নাতের পথ—আবার জাহান্নামের দোরগোড়াও। তুমি কোনটা বেছে নেবে, তা তোমার উপর নির্ভর করে। হে প্রিয় পথিক! একটুখানি সতর্কতা, একটুখানি তাকওয়া, একটুখানি ইখলাস—তোমার চলার পথকে করবে নুরানী।

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি